চলতি বছর শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে, শীত নিয়ে যা বলছেন আবহাওয়াবিদ
বাংলাদেশে শীতের আগমন, তাপমাত্রার ওঠানামা ও শীতের তীব্রতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে ইতিমধ্যে হিমেল হাওয়া ও হালকা কুয়াশা অনুভূত হচ্ছে। তবে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শীতের আমেজ পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন। এদিকে চলতি বছর শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকা ‘এল নিনো’ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাবে বাংলাদেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকা, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া কিংবা কিছু এলাকায় খরার মতো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এর প্রকৃত প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে এল নিনোর শক্তি, সময় এবং অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের প্রকোপ দৃশ্যমান হতে শুরু করতে পারে। তবে আবহাওয়াবিদদের মতে, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই তিন মাসই বাংলাদেশের শীতকাল। উত্তরাঞ্চলে শীতের আমেজ, ঢাকায় অপেক্ষা বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী পৌষ ও মাঘ মাসে বাংলাদেশে শীতের প্রকৃত দাপট দেখা যায়। তবে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে এরই মধ্যে হিমেল হাওয়া অনুভূত হতে শুরু করেছে। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ভোরে হালকা কুয়াশা ও ঠান্ডা আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শীতের অনুভূতি আরও পরে বাড়তে পারে।
সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই তিন মাস শীতকাল। সে হিসাবে ডিসেম্বরের আগে প্রকৃত শীতকাল শুরু হয় না। তবে উত্তরবঙ্গে ইতিমধ্যে হালকা শীতের আমেজ অনুভূত হতে শুরু করেছে। সূর্যের দক্ষিণায়নের কারণে উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রায় পরিবর্তন আসছে। উত্তরবঙ্গ তুলনামূলকভাবে উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে শীতের প্রভাব আগে অনুভূত হয়। গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় হালকা কুয়াশাও দেখা যাচ্ছে। তবে কুয়াশার ক্ষেত্রে বায়ুদূষণেরও প্রভাব রয়েছে। ঢাকায় শীতের অনুভূতি আসতে আসতে জানুয়ারি মাস হয়ে যেতে পারে।
এবার শীতের তীব্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ে তিনি বলেন, তুলনামূলকভাবে এ বছর তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকতে পারে। তবে কুয়াশার কারণে শীতের অনুভূতি বেড়ে যেতে পারে। যেমন, তাপমাত্রা ১২, ১৫ বা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও সারাদিন সূর্যের দেখা না মিললে বেশি শীত অনুভূত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাপমাত্রা খুব একটা না কমলেও মানুষের কাছে শীতের তীব্রতা বেশি মনে হবে।’
এ বছর তাপমাত্রা বেশি থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এ বছর এল নিনোর প্রভাব রয়েছে। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণা এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসেও এল নিনোর প্রভাব থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। ফলে শীতকালেও বাংলাদেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাপমাত্রার ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব সারা বিশ্বেই দেখা যাচ্ছে।’
এল নিনো ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, এল নিনো ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দুটিই তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গত চার মাসে তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি বেড়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার গবেষণায় ভবিষ্যতে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উঠে এসেছে। এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা। এ সময় পেরুর উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের একটি নির্দিষ্ট সঞ্চালনপ্রক্রিয়া জড়িত। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে।
তিনি বলেন, ‘এর প্রভাবে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। আবার কোথাও খরার প্রকোপ বাড়তে পারে। অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে। কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়, আবার কোথাও তাপমাত্রা এক থেকে দুই ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে এল নিনোর প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, এটি ইতিহাসে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, শক্তিশালী এল নিনো খরা ও অতিবৃষ্টির পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করবে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়াবে।
এল নিনোর সময় সমুদ্র তার তাপ বায়ুমণ্ডলে স্থানান্তর করে। এতে বায়ুর তাপমাত্রা বাড়তে পারে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই বেড়ে যাওয়া বৈশ্বিক তাপমাত্রার সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে একই রকম হয় না। পৃথিবীর কোন অঞ্চলে এবং বছরের কোন সময়ে এর প্রভাব পড়ছে, তার ওপর আবহাওয়ার পরিবর্তন নির্ভর করে। দুটি এল নিনো কখনো পুরোপুরি একরকম হয় না। সাধারণভাবে শক্তিশালী এল নিনো দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া তৈরি করতে পারে। এতে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্ববাসীকে সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এল নিনোর পরিস্থিতি উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর আগুনে আরও জ্বালানি ঢালবে। এর প্রভাব আরও কঠিনভাবে আঘাত হানবে, আরও দূরে পৌঁছাবে এবং ভয়াবহ গতিতে সীমান্ত অতিক্রম করবে।’
দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে খরার কারণে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন এক সময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যখন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়া, খাদ্য সরবরাহ সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার যেসব জনগোষ্ঠী মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্যও এল নিনো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ সময় সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে আসা ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানির পরিমাণ কমে যায়। ফলে অ্যাঞ্চোভিসসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য কমে যেতে পারে। এতে মাছের উৎপাদনও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কিছু বিজ্ঞানী বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর তুলনা করছেন। সেটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো। ওই সময় ক্যারিবীয় অঞ্চলে পানির সংকট দেখা দেয়, মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে রেকর্ডসংখ্যক ঝড় তৈরি হয় এবং আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে খরা দেখা দেয়।জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঝড় ও বিস্তৃত খরার সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যসংকটে পড়ে। এসব ঘটনার পেছনে অন্তত আংশিকভাবে এল নিনোর ভূমিকা ছিল।
বাংলাদেশকে ঘিরে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণে সতর্কতার বার্তা উঠে এসেছে। তবে এর প্রভাব নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন মাসে দেশের ওপর অন্তত ৮ থেকে ১০টি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই তিন থেকে চারটি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক জলবায়ু গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘অভিজ্ঞতা বলছে, এল নিনো থাকলে দেশের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ ও খরাসদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়ে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
জলবায়ুর এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরাও। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক এবং বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাজিব কুমার সাহা বলেন, এল নিনো থামানো সম্ভব নয়, তবে এর অভিঘাত ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।