১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৪

এল নিনো মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপান-চীন ও শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ কী ভাবছে?

দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে বনের একাংশ  © ফাইল ছবি

শক্তিশালী এল নিনোর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার। খরা, দাবানল, টাইফুন, বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ ও খাদ্যসংকট— একসঙ্গে একাধিক সংকট মোকাবিলায় এরই মধ্যে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে দেশগুলোতে । বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার কারণে এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের শেষ দিকে এবং ২০২৭ সালের শুরুতে এটি খুব শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, এর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।

এল নিনোর চরম প্রভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। যে কারণে বৈশ্বিক এই দুর্যোগের প্রভাব কমাতে এরইমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে শ্রীলঙ্কা চীনসহ অঞ্চলটির নানান দেশ। চীনে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় ১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। খরা ও অতিবৃষ্টির মতো বিপরীতমুখী পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন রক্ষায় পানি সংরক্ষণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

জুলাইয়ে চীনের সরকার বিভিন্ন শহরকে ‘জলবায়ু ঝুঁকি মানচিত্র’ তৈরির পরিকল্পনা নিতে বলেছে। এর মাধ্যমে বন্যা ও তীব্র তাপপ্রবাহের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হবে।

হংকংয়ে তীব্র গরমের কারণে কর্মক্ষেত্রের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। অতিরিক্ত গরমের সময় কর্মীদের কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, শীতলীকরণ সরঞ্জাম ও বিশ্রামের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাইওয়ানও চরম তাপমাত্রাকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করছে। সেপ্টেম্বরে সেখানে টানা তিন দিন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার পরিস্থিতি ধরে একটি বড় মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া, রেল যোগাযোগে সমস্যা এবং অতিরিক্ত গরমে ব্যাপক মানুষ অসুস্থ হওয়ার মতো পরিস্থিতি অনুশীলন করা হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর প্রভাব এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। ভারতের বিভিন্ন এলাকায় সেপ্টেম্বরে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে ধান, ডাল, তুলা ও ভুট্টাসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারতে ৩৫০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় পানি সংরক্ষণ ও পানি ধরে রাখার অবকাঠামো বাড়ানো হচ্ছে। কৃষকদের কম পানি লাগে এমন স্বল্পমেয়াদি ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

তবে এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে তীব্র পরিস্থিতির মুখে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। বৃষ্টির ঘাটতি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে দেশটি এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখে পড়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ পানীয় জলের সংকটে রয়েছেন। পানির সংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে শ্রীলঙ্কার ইয়ালা জাতীয় উদ্যানের পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে হাতি, চিতাবাঘসহ বিভিন্ন প্রাণীর জন্য ট্যাংকারে করে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। 

দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, মিঠা পানির উৎসগুলো শুকিয়ে গেলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে ব্যবহার করতে হতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট এবং মৌসুমি দাবানল। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের ধোঁয়ায় বিভিন্ন শহরের বায়ু দূষিত হচ্ছে। ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি কমাতে চাষের সময়সূচি পরিবর্তন ও পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে এবারের পরিস্থিতির মাত্রা বেশি হওয়ায় এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নাও হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

আঞ্চলিকভাবে ধানের উৎপাদন ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশে খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের ওপর এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন সরকার ও কৃষক সমবায়গুলো পুনরুজ্জীবনমূলক কৃষি এবং জৈব সার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলতি বছরের জুলাই ছিল রেকর্ড পরিমাণ শুষ্ক। এর কয়েক সপ্তাহ পরই সেখানে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত হয়। তীব্র গরমের কারণে দেশটির কৃষকেরা মাটির নিচে আলু সিদ্ধ হয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও জানিয়েছেন।

১৮ বছর পর দেশটির আবহাওয়া সংস্থা তাপপ্রবাহের সতর্কতা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। নতুন সর্বোচ্চ স্তরের সতর্কতা জারি হলে অনুভূত তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে জরুরি নয় এমন বাইরের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হবে। দেশটির সরকার তীব্র গরমের সময় মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে নিয়মিত সতর্কবার্তাও পাঠাচ্ছে।

এল নিনো ও মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে জাপানেও তীব্র গরম ও শক্তিশালী টাইফুনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ে জাপানে প্রথমবারের মতো সরকারি পর্যায়ে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাকে ‘কোকুশোবি’ বা ‘অত্যন্ত ভয়ংকর গরমের দিন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

গরমের মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন সম্ভাব্য শক্তিশালী টাইফুনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। নাগরিকদের সরকারি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা মেনে চলা এবং আগে থেকেই খাবার ও পানি মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারীদের ঝড়ের সময় উড়ে গিয়ে বিপজ্জনক হতে পারে—এমন ফুলের টব ও আসবাবপত্র ঘরের ভেতরে সরিয়ে রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ভারী বৃষ্টির সময় আগেই বন্ধ করে দেওয়ার জন্য জাতীয় মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি আন্ডারপাস চিহ্নিত করেছে জাপানের অবকাঠামো মন্ত্রণালয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে এবারের শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলোকে একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা, দাবানল, ঝড় ও খাদ্যসংকট মোকাবিলা করতে হতে পারে।