১২ জুন ২০২৬, ১০:৩৪

শুরু হচ্ছে এল নিনো, ভয়ংকর দাবদাহের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ 

প্রতীকী ছবি  © সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া তৈরি করতে সক্ষম প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রক্রিয়া ‘এল নিনো’ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। আগামী শরৎকালেই এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও শক্তিশালী রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন আবহাওয়াবিদেরা। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যারোনমেটিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) বিষুবরেখার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে এল নিনো গঠনের ঘোষণা দেয়। যার ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টির মুখে পড়তে যাচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ। যেখানে ভয়ংকর দাবদাহের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত,পাকিস্তান সহ বেশ কয়েকটি দেশ। খবর গার্ডিয়ানের 

বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এবারের এল নিনো হতে পারে এই শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এল নিনোর এই আগমনকে একটি ‘জরুরি জলবায়ু সতর্কতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

নোয়ার তথ্য অনুযায়ী, আগামী শরৎকালের শেষভাগ এবং শীতের শুরুতে এই এল নিনো এতটাই তীব্র আকার ধারণ করতে পারে যে, ১৯৫০ সালের পর থেকে রেকর্ডকৃত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এল নিনোগুলোর তালিকায় এটি স্থান করে নেবে। এর সম্ভাবনা প্রায় ৬৩ শতাংশ। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জেট স্ট্রিম এবং বৃষ্টির স্বাভাবিক ধরণ বদলে যাবে, যার ফলে তৈরি হতে পারে তীব্র ঝড়, নজিরবিহীন তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং খরা। 

প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হওয়ায় এটি বিশ্বের অনেক জায়গায় চরম আবহাওয়া ডেকে আনবে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এর ফলে বছরের শেষের দিকে আবহাওয়া আরও অস্থির হতে পারে এবং শরৎ ও শীতের শুরুতে অতিরিক্ত আর্দ্র, মৃদু ও ঝড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে।

এল নিনোর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টি ও উচ্চ জোয়ারের কারণে বন্যার ঝুঁকি বাড়বে এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় আর্দ্র শীতকাল দেখা যাবে। তবে তীব্র গরমের কারণে মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন স্ট্যানফোর্ডের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ মার্শাল বার্ক। এ ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও বন্যা এবং অতিরিক্ত উষ্ণ গ্রীষ্মকাল দেখা দিতে পারে। 

তীব্র খরায় ভুগতে থাকা মধ্যপ্রাচ্য এই এল নিনোর কারণে কিছুটা উপকৃত (বৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ায়) হতে পারলেও, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা খরা এবং বিপজ্জনক ভারী বৃষ্টির মতো আবহাওয়ার চরম দুই রূপেরই মুখোমুখি হতে পারে। এশিয়ায় বিশেষ করে ভারতে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় খরা, তীব্র গরম ও দাবানল সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এল নিনোর কারণে সৃষ্ট খরা দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ব্রাজিলে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ভুট্টা এবং ধানের মতো প্রধান শস্যগুলো এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের সংকট বা শক তৈরি করতে পারে। তবে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি প্রধান উৎপাদনকারী রাজ্যে সয়াবিনসহ কিছু শস্যের জন্য ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

সাধারণত এল নিনো গ্রীষ্মে শুরু হয়ে শীতকালে চূড়ান্তে পৌঁছায় এবং পরের বসন্তে শেষ হয়। তবে এবার সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর শক্তিশালী লক্ষণ দেখে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী মুহাম্মদ আজহার এহসান পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, এই এল নিনো এক বা দুই মাস আগেই তার সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েল ভেচি জানান, এত বড় এল নিনো সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়। 

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বিশ্বজুড়ে যে উষ্ণতা বাড়ছে, তার কারণে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী এল নিনো দেখা যেতে পারে। এই এল নিনোর বিলম্বিত ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে আগামী ২০২৭ সাল হতে পারে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। ইতোমধ্যেই এই এল নিনোকে আবহাওয়াবিদেরা ‘সুপার এল নিনো’ বা ‘গডজিলা’ নামে ডাকতে শুরু করেছেন। তবে বিজ্ঞানীরা আতঙ্কিত না হয়ে বিশ্ববাসীকে এই চরম আবহাওয়া মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।