০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৪

শুধু আকাশ নয়, মাটি পর্যবেক্ষণেই মিলবে ঝড়-বজ্রপাতের পূর্বাভাস

প্রতীকী ছবি   © টিডিসি ফটো

বজ্রপাত ও ঝড়ের পূর্বাভাস পেতে এতদিন মূলত বায়ুমণ্ডলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হতো। তবে নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু আকাশ পর্যবেক্ষণ করলেই হবে না; মাটির অবস্থাও বিশ্লেষণ করতে হবে। ব্রিটেনের একদল বিজ্ঞানী আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির একটি অংশে প্রায় ২০ বছর ধরে ঝড় ও বজ্রপাত পর্যবেক্ষণ করে দাবি করেছেন, এসব ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে না; এর আগে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ দেখা যায়।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ইউকে সেন্টার ফর ইকোলজি অ্যান্ড হাইড্রোলজি। প্রতিষ্ঠানটি কখন বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি ও ঝড় শুরু হয় এবং তার আগের মুহূর্তগুলোর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। গবেষকদের মতে, যদি আগেভাগেই বজ্রপাত ও ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো যাবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

গরমের দুপুর বা বিকেলে অনেক সময় খুব দ্রুত বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি শুরু হয়। কখনও কখনও ৩০ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে আকাশে মেঘ জমে যায় এবং সেখান থেকে বৃষ্টি, বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়। এত দ্রুত এই পরিবর্তন ঘটে যে অনেক ক্ষেত্রেই ঝড় শুরু হওয়ার আগেই তার সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয় না।

তবে গবেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ঝড় ততটা এলোমেলোভাবে তৈরি হয় না। তাদের মতে, মাটির আর্দ্রতা এবং ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি স্তরের বাতাসের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলেই ঝড় সৃষ্টি হয়। এই মিথস্ক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট ধরণ রয়েছে এবং সেটি বিশ্লেষণ করা গেলে আগেভাগেই বজ্রপাত ও ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব।

এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা সাহারা মরুভূমির একটি অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে ঝড় ও বজ্রপাত পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেখানে প্রায়ই হঠাৎ ঝড় ওঠে এবং বজ্রপাত ঘটে। ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ২২ লাখ ঝড় ও বজ্রপাতের সময় বায়ুমণ্ডল এবং ভূপৃষ্ঠের অবস্থা বিশ্লেষণ করেছেন তারা। এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে উপগ্রহচিত্র। বিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল সংখ্যক ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝড়ের পূর্বসঙ্কেত সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে এবং সেই ভিত্তিতে তারা পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের দাবি, এই গবেষণার ফল শুধু আফ্রিকার জন্য নয়, পৃথিবীর যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যেখানে মাটি শুষ্ক থাকে সেখানে ভূপৃষ্ঠ দ্রুত উত্তপ্ত হয়। আর যেখানে মাটি ভিজে থাকে সেখানে দীর্ঘ সময় ঠান্ডা থাকে। এই তাপমাত্রার পার্থক্যই মেঘ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি।

এর আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, বায়ুর উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের চাপ ও গতির পরিবর্তনের ওপরই ঝড়ের সৃষ্টি নির্ভর করে। তবে নতুন গবেষণায় কয়েকজন বিজ্ঞানী দাবি করেছেন, মাটির আর্দ্রতাও ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে এবং সেই প্রভাব থেকে হঠাৎ করেই ঝড় বা বজ্রপাত হতে পারে। তাদের মতে, ঝড় ও বজ্রপাতের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান উপাদান হলো বায়ুচাপের হঠাৎ পরিবর্তন এবং মাটির আর্দ্রতা। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে দ্রুত মেঘ তৈরি হয়ে ঝড়বৃষ্টি এবং বজ্রপাত ঘটতে পারে।

বিজ্ঞানীরা জানান, তাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ছিল ঠিক কোথায় বজ্রপাত হতে পারে তা নির্ধারণ করা। এ ক্ষেত্রে তারা প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছেন। গবেষকদের একটি অংশের মতে, উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করলে তা সম্ভাব্য বজ্রপাতের স্থান নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে।

বিজ্ঞানীরা আরও মনে করেন, ঝড় কতটা শক্তিশালী হবে বা কতবার বজ্রপাত ঘটতে পারে, তা অনেকটাই নির্ভর করে মাটির আর্দ্রতার ওপর। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করেই নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে কোথায় বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি।

গবেষকদের দাবি, বায়ুচাপের পরিবর্তন ও মাটির আর্দ্রতা—এই দুটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করলে ঝড় শুরু হওয়ার প্রায় ছয় ঘণ্টা আগেই তার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি কোথায় ঝড় হবে এবং কোথায় বজ্রপাত ঘটতে পারে, সেটিও নির্ধারণ করা যাবে। শুধু বায়ুর চাপ, গতি ও প্রবাহের দিকের তথ্যের সঙ্গে মাটির আর্দ্রতার তথ্য মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলেই জানা যেতে পারে কোথায় কখন ঝড় ও বজ্রপাত ঘটবে। [সূত্র: আনন্দবাজার]