বাড়ছে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা, ৮৭০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বিপিডিবি
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে দেশের একমাত্র পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ৮৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে কমে যাওয়া ইউনিট দুটির উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার হবে। এতে দুই ইউনিট থেকে পূর্ণ ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পে ৬৫৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ, ২০০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা সরকারি তহবিল এবং ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিপিডিবির নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট ১৯৮৮ সালে স্থাপন করা হয়। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন যান্ত্রিক ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্তমানে প্রতিটি ইউনিট থেকে ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে দুই ইউনিটের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত একটি ইউনিটে প্রতি ১০ বছর পর পর পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রয়োজন হয়। তবে আর্থিক ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের প্রয়োজনীয় সংস্কার পুরোপুরি করা সম্ভব হয়নি। ইউনিট দুটি সর্বশেষ সংস্কার করা হয়েছিল যথাক্রমে ২০১০ সালের জুন ও ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে।
জানা গেছে, ইউনিট দুটির সংস্কারের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ২০১৮ সালে। তবে ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সাত বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পটি আটকে ছিল। এ পর্যন্ত তিনবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিভিন্ন কারণে সেগুলো বাতিল হয়ে যায়।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট তোশিবার প্রযুক্তিতে নির্মিত। ফলে তোশিবার প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি দরপত্রের শর্ত পূরণ করতে পারেনি। পরে স্থানীয় ঠিকাদারদের আপত্তির কারণে ওই দরপত্র প্রক্রিয়াও বাতিল হয়ে যায়। এতে ইউনিট দুটির সংস্কারকাজ আরও দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।
সংস্কারের কাজ না হওয়ায় এত দিন জরুরি ওভারহলিং ছাড়াই অস্থায়ী মেরামতের মাধ্যমে ইউনিট দুটি চালু রাখা হয়েছে। এতে একদিকে উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকিও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিডিবির প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ইউনিট দুটির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংস্কার ও পরিবর্তন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে রোটর রিম সাপোর্ট, স্টেটর কয়েল, রোটর পোল, ইনসুলেশন, টারবাইনের রানার, শ্যাফট সিল ও বিয়ারিং। এ ছাড়া গভর্নর, অটোমেশন ও কন্ট্রোল সিস্টেম এবং অন্যান্য অক্সিলিয়ারি সিস্টেমেরও উন্নয়ন করা হবে।
এসব সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুরোনো যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইউনিট দুটির নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনার সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, ‘বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের পুনর্বাসনের জন্য সংস্কার প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগবে।’
মাহমুদ হাসান বলেন, ‘সংস্কারকাজ সম্পন্ন হলে ইউনিট দুটির মোট ১০০ মেগাওয়াট পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এতে কেন্দ্রটির বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি কমার পাশাপাশি জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের প্রচলিত অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যয় কম। এ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় মাত্র ৪০ থেকে ৫০ পয়সা। একই সঙ্গে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থায়িত্বও অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বেশি।