০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১:২৭

চাকরি, ভর্তি ও ক্লাস-পরীক্ষার প্রস্তুতি সহজে এআইনির্ভর অ্যাপ তৈরি করলেন চবি শিক্ষার্থী

মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন ও তাঁর তৈরি অ্যাপ ‘Porikkhadaw Al’  © টিডিসি ছবি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করে সময় কাটান অনেক শিক্ষার্থী। অথচ চাকরি কিংবা ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তাদের অনেককেই মডেল টেস্ট ও অনুশীলনের জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল চাকরিপ্রার্থীদের জন্য প্রস্তুতির এই ব্যয় অনেক সময় বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়। এমন বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রলিংয়ের অভ্যাসকে শেখার সুযোগে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) একটি অ্যাপ ‘Porikkhadaw Al’ তৈরি করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি অ্যাপটি নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন এর নির্মাতা মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার লেলাং গ্রামের সন্তান। অ্যাপটি এখন গুগল প্লে স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে চাকরি, ভর্তি পরীক্ষা, স্কুল-কলেজের শ্রেণিভিত্তিক পরীক্ষা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য একাধিক ফিচার যুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জালাল উদ্দীন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডের আদলে সাজানো হয়েছে অ্যাপটির 'কিউফিড' (QFeed)। সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক পোস্ট স্ক্রল করে ব্যবহারকারীরা সময় কাটান। তবে এই অ্যাপের কিউফিডে ব্যবহারকারীরা অন্যদের পোস্ট করা বিভিন্ন প্রশ্ন দেখতে পারবেন এবং সেগুলোর ব্যাখ্যাসহ সমাধান জানতে পারবেন। ফলে অবসরে ফিড স্ক্রল করার সময়ও নতুন কিছু শেখা ও নিজের জ্ঞান যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

উদ্যোগটির পেছনের ভাবনা সম্পর্কে জালাল বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিটি স্ক্রলেই অনেক সময় নষ্ট হয়। আমি সেই স্ক্রলিংয়ের অভ্যাসকে শেখার কাজে ব্যবহার করতে। আমার তৈরি এই কিউফিডে একজন ব্যবহারকারী অন্যদের পোস্ট করা প্রশ্ন ও তার ব্যাখ্যাসহ সমাধান দেখতে পারবেন। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভ্যাসকে পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

চাকরিপ্রার্থীদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তার উদ্যোগের অন্যতম বিবেচনা। জালাল উদ্দীন জানান, চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অনেক প্রার্থীকে মডেল টেস্ট দেওয়ার জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ একজন চাকরিপ্রার্থী নিজেই অনেক সময় আর্থিক সংকটে থাকেন। এ অবস্থায় প্রস্তুতির জন্য বারবার অর্থ খরচ করা তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে। তাই অ্যাপটিতে সব মডেল টেস্ট বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

গেইমের মাধ্যমে পড়াশোনা-কুইজ

অ্যাপের নির্মাতা জালাল উদ্দীন বলেন, অ্যাপটিতে প্রচলিত মডেল টেস্টের পাশাপাশি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা তৈরির সুবিধাও রয়েছে। ব্যবহারকারীরা পছন্দমতো প্রশ্ন নির্বাচন, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ এবং নেগেটিভ মার্কিংয়ের নিয়ম ঠিক করে কাস্টম মক টেস্ট দিতে পারবেন। পরীক্ষার ফলাফল, স্কোর, পড়াশোনায় ব্যয় করা সময় ও অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। পাশাপাশি কঠিন প্রশ্ন এবং দুর্বল বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সেসব বিষয়ে বাড়তি অনুশীলনের সুযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া অ্যাপটিতে 'স্ট্রিক গেম' নামে একটি কুইজভিত্তিক ফিচার যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী একটানা কতটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেন, তা যাচাই করতে পারবেন। শেখার পাশাপাশি নিজের দক্ষতা যাচাই ও অনুশীলনে আগ্রহ ধরে রাখাই এ ফিচারের উদ্দেশ্য।

২৪ ঘণ্টা এআই সহায়তা ও লাইভ মেন্টরিং

চাকরিপ্রার্থীদের জন্য অ্যাপটিতে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখা, সরাসরি আবেদন এবং আবেদনের বর্তমান অবস্থা অনুসরণের সুবিধাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষা ও প্রবেশপত্র সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টা এআই সহায়তা, লাইভ মেন্টরিং এবং সহপাঠীদের সঙ্গে ছবি, ফাইল ও ভয়েস নোট আদান-প্রদানের সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে।

অ্যাপটির নির্মাতা জালাল উদ্দীন বলেন, বর্তমানে এটি ১৫ মাস বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আগে নিবন্ধন করা ব্যবহারকারীরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিনামূল্যে ব্যবহারের সুবিধা পাবেন। নতুন ব্যবহারকারীরা নির্ধারিত প্রমো কোড ব্যবহার করে এ সুবিধা নিতে পারবেন। এ ছাড়া ব্যবহারকারীর আমন্ত্রণ লিংকের মাধ্যমে নতুন কেউ নিবন্ধন করলে আমন্ত্রণকারী অতিরিক্ত এক মাস করে বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

অ্যাপটির ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে জালাল উদ্দীন জানান, অ্যাপটির আরও কিছু ফিচার বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। ব্যবহারকারীদের মতামত ও সমস্যার ভিত্তিতে সেগুলো উন্নত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

শিক্ষার্থীদের সময়কে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রস্তুতির সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার ভাবনা থেকে তৈরি এই অ্যাপটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নির্ভর করবে এর তথ্যের নির্ভুলতা, ফিচারগুলোর বাস্তব কার্যকারিতা এবং ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতার ওপর। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রলিংকে শেখার সুযোগে রূপান্তরিত করার চিন্তাটি শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল অভ্যাস নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।