ঢাবি-বুয়েট-মেডিকেল: চার টপারের সফলতার গল্প
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। কেউ পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান, আবার কেউ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য থেকে সামান্য দূরত্বে থেমে যান। তবে এই অসংখ্য ফলাফলের ভিড়ে কয়েকটি নাম আলাদা করে আলোচনায় আসে—যারা জাতীয়ভাবে প্রথম হন। সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কিংবা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন তারা। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে প্রথম হওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকে একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য, সময়কে নিখুঁতভাবে কাজে লাগানোর দক্ষতা, নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা এবং সবচেয়ে বড় কথা- দীর্ঘ সময় ধরে একই গতিতে লেগে থাকার অসাধারণ মানসিক শক্তি।
গত ভর্তি মৌসুমে বুয়েট, ঢাবি, মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয়ভাবে প্রথম হওয়া কয়েকজন কৃতী শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে তাদের সাফল্যের অন্তরালের গল্প জানার চেষ্টা করেছে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস। কী ছিল তাদের দৈনন্দিন রুটিন, কত ঘণ্টা পড়তেন, কীভাবে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতেন, হতাশা ও মানসিক চাপ সামলাতেন কীভাবে, পরীক্ষার হলে কী কৌশল অনুসরণ করেছেন এবং আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য কী বার্তা দিতে চান। তাদের অভিজ্ঞতা হয়ত শুধু ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য নয়, যেকোনো বড় স্বপ্ন দেখা মানুষের জন্যই হতে পারে এক মূল্যবান দিকনির্দেশনা।
এসএসসিতে বোর্ডে দ্বিতীয় থেকে বুয়েটে প্রথম রাদওয়ান
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী রাদওয়ান রিদভী আকিফ। এসএসসিতে ঢাকা বোর্ডে দ্বিতীয় হয়েছিলেন তিনি। তারপর থেকেই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল বুয়েটে প্রথম হওয়া। কীভাবে তিনি প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছেন, কীভাবে ম্যাথ-ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে নিজ স্ট্র্যাটেজি তৈরি করেছেন এবং কীভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শেষ পর্যন্ত টিকে থেকেছেন।
সাফল্যের অনুভুতি জানিয়ে আকিফ বলেন, রেজাল্ট প্রকাশের নির্ধারিত দিন ছিল ২৮ জানুয়ারি। সবাই ধারণা করছিল, সেদিনই ফল প্রকাশ হতে পারে। রাত ৯টার দিকে গুঞ্জন উঠল, খাতা মূল্যায়নের কাজ শেষ হয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হবে। এরপর থেকেই অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কোনো ফল না আসায় ঘুমিয়ে পড়ি। যদিও উত্তেজনার ঠিকমতো ঘুম আসছিল না। শেষ পর্যন্ত ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে যাই।
হঠাৎ কিছুক্ষণ পর আতিয়ার ভাইয়ের ফোনে ঘুম ভাঙে। ফোন ধরেই তিনি বললেন, ‘আকিফ, রেজাল্ট দেখেছো?’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘ভাই, কিসের রেজাল্ট?’ তখন তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি তো বুয়েটে প্রথম হয়েছো।’
কথাটা শুনে আমি পুরোপুরি হতবাক হয়ে যাই। কারণ, আমি ভেবেছিলাম সেদিন আর ফল প্রকাশ হবে না। সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার কথা শুনে আম্মু রুমে এসে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। আমি বললাম, ‘আম্মু, আমি নাকি বুয়েটে প্রথম হয়েছি।’ খবরটি শুনে আম্মু ভীষণ খুশি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে আব্বুকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। পরে জানতে পারি, আতিয়ার ভাই এর আগেও দুই-তিনবার ফোন করেছিলেন, কিন্তু আমি ঘুমের মধ্যে কেটে দিয়েছিলাম।
জুনিয়রদের উদ্দেশ্যে রাদওয়ান রিদভী আকিফ বলেন, ‘শুরু থেকেই লক্ষ্য একদম পরিষ্কার রাখতে হবে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জন। একবার এগিয়ে গেলে সেই অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। কারণ, আপনি একটু ঢিল দিলে পেছনেররা সহজেই সামনে চলে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রস্তুতির সময়ে হতাশা বা মানসিক চাপ আসতেই পারে। তবে সেসব মুহূর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্য ধরে পরিশ্রম চালিয়ে যেতে হবে। আমার বিশ্বাস, আল্লাহ কখনো পরিশ্রমী মানুষকে নিরাশ করেন না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সাময়িকভাবে অনেক কিছু ছাড় দিতে হয়। সেই ত্যাগের মানসিকতা যার থাকবে, সফল হওয়ার সম্ভাবনাও তারই বেশি।’
স্কুলজীবনের স্বপ্ন থেকে ঢাবিতে প্রথম শাহরিয়ার শিমুল
স্কুলজীবন থেকেই একটি স্বপ্ন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। সেই স্বপ্নকে লক্ষ্য বানিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলেছে নিরলস প্রস্তুতি। পরিবারের নিরন্তর অনুপ্রেরণা, বড় ভাইদের দিকনির্দেশনা, শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা এবং নিজের অবিচল পরিশ্রমে শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নই বাস্তব রূপ নিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় মানবিক শাখায় জাতীয় মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছেন মোহাম্মদ শাহরিয়ার শিমুল। ভর্তি পরীক্ষায় পূর্ণ ৮০ নম্বর এবং এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে ২০ নম্বরসহ সর্বমোট ১০০ নম্বর পেয়ে তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যয়নরত।
সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শাহরিয়ার শিমুল বলেন, প্রথমে মহান রব্বুল আলামীনের প্রতি শুকরিয়া আদায় করছি। তাঁর অশেষ রহমত ছাড়া আমি কখনো আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে পারতাম না।
তিনি জানান, স্কুলজীবন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন লালন করতেন। সাধারণত অনেক শিক্ষার্থীর মতো তারও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তার অনুভূতি ভিন্ন ছিল। সেই অনুভূতি ধীরে ধীরে দৃঢ় সংকল্পে রূপ নেয়। নিজেকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন, যেকোনোভাবেই হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে।
এই পথচলায় পরিবারের অবদানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন শিমুল। তিনি বলেন, বাবা-মা সবসময় আমাকে এবং আমার ভাইকে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। বিশেষ করে মা পড়াশোনার বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তিনি নিয়মিত খোঁজ রাখতেন পড়াশোনার অগ্রগতি, পরীক্ষার ফলাফল এবং প্রস্তুতির বিষয়ে। তবে কখনো চাপ সৃষ্টি করেননি। এবং এমন একটি পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা সহজ হয়েছে।
ভর্তি পরীক্ষার পুরো প্রস্তুতির সময় বড় ভাইয়ের সহযোগিতাও ছিল তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিমুল বলেন, ‘আমার বড় ভাই শুধু অভিভাবক নন, তিনি আমার জীবনের একজন রোল মডেল। তার পরামর্শ, দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ আমাকে সবসময় আত্মবিশ্বাসী থাকতে সহায়তা করেছে।’
কলেজজীবনে ওঠার পর তার লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষক ও সিনিয়রদের কাছ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পান। এরপর থেকেই পরিকল্পনাভিত্তিক প্রস্তুতি শুরু করেন এবং নিজের দুর্বল জায়গাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যান।
তিনি বলেন, ফল প্রকাশের দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের পর প্রথমে মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেছি। আমি বিশ্বাস করি, সাফল্য অর্জন কঠিন, তেমনি সেটা ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। আর এ জন্য পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে একই নিষ্ঠা, সততা এবং অধ্যবসায়ের সঙ্গে নিজেকে এগিয়ে নিতে চাই।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কথা জানিয়ে শাহরিয়ার শিমুল বলেন, সবার কাছে দোয়া চাই, যেন ভবিষ্যতেও একই নিষ্ঠা ও পরিশ্রম ধরে রাখতে পারি। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
নিজের মোবাইল অন্যের কাছে রেখে দিয়েছিলেন মেডিকেলে প্রথম হওয়া শান্ত
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় সারাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন নরসিংদীর সন্তান ও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের কৃতী শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীর আলম শান্ত। ৯১.২৫ নম্বর পেয়ে জাতীয় মেধা তালিকার শীর্ষে ওঠেন তিনি।
শান্তর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে নরসিংদীর বেলাবো উপজেলায়। তিনি বাউসা রেসিডেন্সিয়াল মডেল হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য ঢাকায় এসে তেজগাঁওয়ের সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ভর্তি হন। পরিবার ছেড়ে মেসে থেকে পড়াশোনা করাটা ছিল তার জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। কলেজ জীবনের শুরুতে শান্তর লক্ষ্য ছিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের একটি প্রশ্নব্যাংক সমাধান করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাতেও ভালো করার সক্ষমতা তার রয়েছে। সেখান থেকেই তার লক্ষ্য বদলে যায়।
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় শান্ত ছিলেন অত্যন্ত কৌশলী ও শৃঙ্খল। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন তিনি। শান্ত বলেন, ‘মোবাইল আমার ফোকাস নষ্ট করছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিই, প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল আমার কাছে থাকবে না।’ তিনি নিজের বাসার এক পরিচিত আন্টির কাছে ফোন রেখে দিতেন এবং কেবল জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন।
পড়ালেখার সময়সূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সকালে পড়তেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তার ভাষায়, ‘আমি সকালের স্টুডেন্ট। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত পড়লে পড়াগুলো সবচেয়ে ভালো মনে থাকে।’
শান্তর সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, অক্টোবরে শান্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১০১২ দিন পড়াশোনার বাইরে থাকতে হয়। এতে তিনি সাময়িকভাবে হতাশ হয়ে পড়লেও দ্রুত মানসিক শক্তি ফিরে পান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমে একটু ডিপ্রেসড হয়েছিলাম। পরে ভাবলাম, আল্লাহ যেহেতু এটা দিয়েছেন, নিশ্চয়ই এর ভেতর কোনো কল্যাণ আছে। ওই সময় যা পড়তাম, সেটাই পরীক্ষায় আসত না।’ পরীক্ষার হলে শান্ত ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। প্রশ্ন তুলনামূলক সহজ মনে হওয়ায় তিনি ১০০টি প্রশ্নই উত্তর দাগান। শান্ত বলেন, ‘চান্স পাইলে পাইলাম, না পাইলেও সমস্যা নাই, এ মনোভাবে আমি শুধু প্রশ্নই ছিলাম। বের হয়ে মিলিয়ে দেখি, প্রায় ৯২ নম্বরের কাছাকাছি করেছি।’
নিজের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের দোয়া ও বন্ধুদের সমর্থনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন শান্ত। আবেগপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধুরা বলত, তারা যখন আমার বাসায় যেত, দেখত আমার মা বাসায় নামাজ পড়ে আমার জন্য দোয়া করছে। এটা শুনলেই আমার ভেতরে অন্যরকম শক্তি আসত।’
তিনি আরও স্মরণ করেন তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চাচা শামীম স্যারের কথা, যিনি শান্তর চান্স পাওয়ার আশায় নফল রোজার মানত করেছিলেন। বন্ধুরাও পরীক্ষার সময় তার জন্য কোরআন খতম ও দোয়া করেছিলেন, যা তাকে মানসিকভাবে দৃঢ় রাখে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে শান্ত জানান, তিনি একজন অনকোলজিস্ট বা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হতে চান। তার ভাষায়, ‘ক্যান্সার বিষয়টা আমাকে খুব টানে। আল্লাহ কবুল করলে অনকোলজিস্ট হতে চাই।’
সবচেয়ে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শান্ত বলেন, ভর্তির পড়াশোনা এইচএসসি পর্যায়েই গুছিয়ে শেষ করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘একাডেমিক স্ট্রং থাকলে অনেকটা এগিয়ে যাওয়া যায়। জীবন থেমে থাকার নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে, যার আল্লাহর ওপর ভরসা, তার জন্য যথেষ্ট।’
মেডিকেলে দ্বিতীয় হওয়া নাবিহা বললেন— ‘আমার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই’
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধার দ্বিতীয় হয়েছেন রাজধানীর হলি ক্রস কলেজের শিক্ষার্থী তাসনিয়া তৌফিক নাবিহা। রাজধানীর হলিক্রস স্কুল এবং হলিক্রস কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছেন তিনি। বড় হয়েছেন ঢাকাতেই, তবে গ্রামের বাড়ি উত্তরের জেলা রাজশাহীতে। বাবা সরকারি চাকরি করেন এবং চিকিৎসক। তিনি একটি মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। নাদিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা সক্রিয় নন। নেই কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। ইনস্টাগ্রামে একটি অ্যাকাউন্ট থাকলেও সেভাবে সক্রিয় থাকেন না। নিজের সাফল্য নিয়ে কথা বলেছেন তাসনিয়া তৌফিক নাবিহা।
এই সাফল্যের পেছনের গল্প জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এবার প্রথম মেডিকেল পরীক্ষা দিয়েছি। এজন্য অনেক পড়তে হয়েছে। আমি সব সময় বইয়ের প্রতি অনেক বেশি ফোকাস করতাম। এদিক থেকে আমি বেশি ভালো ছিলাম। মূলত আগে থেকেই বইয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল। মূলত বইভিত্তিক পড়াশোনা বেশি করেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা সক্রিয় নই। ফেসবুকে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। ইনস্টাগ্রামে একটি অ্যাকাউন্ট থাকলেও সেভাবে সক্রিয় ছিলাম না।’
পড়াশোনার রুটিন সম্পর্কে নাবিহা জানান, ‘আমি পরীক্ষা দেওয়া বা ক্লাসকে কখনো পড়াশোনার মধ্যে ধরতাম না। পরীক্ষা বা ক্লাসের বাইরেও পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা পড়াশোনা হতো। আর যদি পরীক্ষাসহ ধরি, সেক্ষেত্রে ১০-১১ ঘণ্টা হয়ে যায়।’
মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এসএসসি-এইচএসসি দুইটার জন্যই ভালোই পড়াশোনা করেছি। অনেক ফাঁকিবাজিও করেছি, পড়াশোনাও করেছি। অ্যাক্টিভিটিস ছিল ভালো। তবে এসএসসি-এইচএসসি তে আমার রেজাল্ট একদম আহামরি অনেক ভালো হয়েছে, তা আমি বলব না। এসএসসিতে ভালো হয়েছিল, এইচএসসিতে একটু কম ভালো হয়েছে। কারণ আমার হাতের লেখা ভালো না। অনেক বড় সমস্যা এটা। এজন্য আমি ভালোই সাফার করেছি। এখন যেহেতু সময় পাচ্ছি, চেষ্টা করব হাতের লেখা ভালো করার জন্য। এছাড়া আরও কিছু ঘাটতি তো ছিল। তবে এভারেজে চিন্তা করলে রেজাল্ট ভালোই হয়েছে, তবে তা মনঃপুত হয়নি।’
চিকিৎসা পেশায় আগ্রহের পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে নাবিহা বলেন, ‘মা ছাড়াও আমার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন চিকিৎসক। ফলে ছোট থেকেই এই পেশাটি পরিচিত। এছাড়া, এই চিন্তাটা আমার মা-বাবা ছোটবেলা থেকেই আমার মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা করেছিল। প্রথমে আমার তেমন একটা ইন্টারেস্ট ছিল না। তবে বড় হতে হতে আমি বুঝতে পারি, ডাক্তার হওয়াটা আমার জন্য সবচেয়ে বেস্ট। কারণ ছোটবেলা থেকেই খুব ইচ্ছা ছিল মানুষের সেবা করব। এ জন্য আমার কাছে মনে হয়েছে সবচেয়ে ভালো প্রফেশন হবে ডাক্তার হওয়া। চিকিৎসক হতে পারলে যেমন রেস্পেক্টফুলি যে জিনিসটা আমি ইচ্ছা সে কাজটা আমি করতে পারব, একই সাথে ভালো রেপুটেশন হবে, ইনকাম হবে। সবকিছু মিলে ভালোই হয় যদি ডাক্তার হওয়া যায়।’
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোনো কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিলেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মেডিকেল ভর্তি কোচিংয়ের সময় উন্মেষে ক্লাস-পরীক্ষা দিয়েছি। আর রেটিনায় অনলাইন ব্যাচে ভর্তি ছিলাম। সেখানে নিয়মিত পরীক্ষাগুলো দিয়েছি। মেডিকেলের মডেল টেস্ট ব্যাচেও ভর্তি ছিলাম। এর বাইরে আর কোনো কোচিংয়ে আমি ছিলাম না।’
মেডিকেলে ভর্তিচ্ছুদের প্রতি পরামর্শ হিসেবে নাবিহা বলেন, ‘পড়তে হবে, পড়া লাগবে। নিজের যত্ন নিতে হবে। এটা একটা বড় বিষয়। আবার নিজের মন কি চায়, এটার পিছনে একটু টাইম দিয়ে ভাবতে হবে— আমি আদৌ ডাক্তার হতে চাই কিনা। আমার যদি লক্ষ্য থাকে আমি ডাক্তার হব, সেক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আমার মধ্যে একটা ইচ্ছা জাগবে যে আরও বেশি ভালো করা উচিত। তার সাথে এটা ঠিক করে নিতে হবে ‘ড্রিম’ কার? আমার স্বপ্ন কি আমারই, নাকি আমার বাবা-মার চাপিয়ে দেওয়া?’
পড়াশোনা অবশ্যই অনেক করতে হবে। এর কোন মাফ নাই। তবে সেটা করতে গিয়ে নিজেকে ভুলে গেলে চলবে না। নিজের নিজে যত্ন নিতে হবে—যোগ করেন নাবিহা।