০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:১৩

‘আগেই ভালো ছিলাম’ পক্ষের মানুষদের জন্য কিছু কথা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন  © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ভালো না হওয়ার অর্থ এই নয় যে অতীতের পরিস্থিতি ভালো ছিল। ‘আগেই ভালো ছিলাম’—এমন ধারণার সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ব্যাংক খাত, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিভিন্ন অনিয়ম এবং ক্ষতির অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।

সোমবার (২ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।

পোস্টে অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘যারা ‘আগেই ভালো ছিলাম’ পক্ষের মানুষ তাদের জন্য কিছু কথা। হ্যাঁ, আমরা এখনও ভালো নেই এর মানে একদম এই না যে তখন ভালো ছিলাম।’

বেসিক ব্যাংকের অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে তিনি লেখেন, মানুষ কি জানে না আব্দুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংক নামক একটি ব্যাংককে কীভাবে একদম পথে বসিয়ে দিয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা এই ব্যাংক থেকে লুট করে গ্রাহকদের পথে বসিয়েছে। আবার মরতে যাওয়া এই ব্যাংককে বাঁচাতে সরকার মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়েছে। সেই টাকাও মেরে দিয়েছে। এই ব্যাংক নিয়ে পত্রিকায় এত লেখার পরও এখন শুনছি ২০২৩ সালেই তাকে নিরাপদে কানাডায় পার করে দিয়েছে। তাকে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান কে বানিয়েছে? ঠিকই ২৪ এর আগে তাকে পার করে দিয়েছে। অথচ মানুষ জানতো সে দেশেই আছে। 

এস আলমের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক মামুন বলেন, মানুষ কি জানেনা এস আলম এই দেশের কয়টা ব্যাংক ফোকলা করে দিয়েছে, কত লক্ষ কোটি টাকা এই দেশ থেকে নিয়ে বিদেশের নাগরিক হয়েছে। এই দেশের বিচারব্যবস্থা থেকে বেঁচে থাকার জন্য যেই দিন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছেড়েছে সেইদিন বাংলাদেশের আজীবন থাকার বিশেষ সুবিধাও পেয়েছে। কে দিয়েছে? কার ইশারায় দিয়েছে?

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে বিদেশে বিনিয়োগের নামে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি লিখেন, ‘ মানুষ কী জানেনা সালমান এফ রহমান কি করেছে? সে শেখ হাসিনার সবচেয়ে কাছের মানুষদের মধ্যে অন্যতম একজন। তার প্ররোচনায় বিদেশে বিনিয়োগের সুবিধা আদায় করে বিনিয়োগের নামে বিভিন্ন দেশে লক্ষ কোটি টাকা পাচার করেছে। এর সম্বন্ধে আর কি বলবো?’

তিনি আরও লিখেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের নাম শুনেননি? শুধু ইংল্যান্ডেই নাকি তার ৩০০ এর বেশি বাড়ি আছে। আরও আছে দুবাইতে, কানাডায়। কয়েকদিন আগে শুনলাম তার ভাইয়ের নাকি ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ইংল্যান্ডে বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে শেখ রেহানা থাকতো। ধারণা করা হয় এইসব কিছুই কেনা হয়েছে শেখ রেহানার জন্যই।’ 

২০২৪ সালের পর সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বিদেশে অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, ২৪ এর পরে যে হাজার হাজার মন্ত্রী, এমপি ও দলের নেতারা ইউরোপ, আমেরিকা, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও ভারতে রাজকীয় জীবন যাপন করছে। সব কিছু মেলালে এইটা কি স্পষ্ট হয় না যে মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নয়নকে ব্যবহার করে দেশ এবং দেশের অর্থনীতিকে একদম ফোকলা করে গেছে আওয়ামী লীগ সরকার? 

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়েও সমালোচনা করেন অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। তিনি বলেন, ‘আপনারা কি জানেন না কাদের ভিসি ও ইউজিসির চেয়ারম্যান বানিয়েছিল ,আওয়ামী লীগ সরকার অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের মত মানুষকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বানিয়েছিল। কি লজ্জার। শুধু তাই না অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিনকেও আওয়ামী লীগ সরকার ভিসি বানিয়েছিল। কেন ইংরেজির অধ্যাপক কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে ভিসি বানাতে পারতেন না?’ 

অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিকের দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ক্ষতি হয়েছে, তা আগামী ৫০ বছরেও পূরণ করা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক আরেফিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই ক্ষতি করে গিয়েছেন তা আগামী ৫০ বছরেও পোষানো সম্ভব কিনা আমি সন্দেহ পোষণ করি। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছে কিন্তু নিয়োগ দেওয়ার মত যোগ্য শিক্ষক দেশে নাই। যোগ্য শিক্ষক হান্ট না করে দলের ক্যাডারদের শিক্ষক বানিয়ে শিক্ষক সম্বন্ধে সমাজে বাজে একটা ধারণা সৃষ্টি করেছে। সমাজ এখন শিক্ষককে আর ভালো চোখে দেখে না কারণ যাদেরকে দেখে এই ধারণা তৈরি হয়েছে তাদেরও শিক্ষক হওয়ারই কথা না। তারাতো শিক্ষক না।’

শিক্ষা খাতে বরাদ্দের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন ঢাবির এই অধ্যাপক। তার দাবি, বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বেশি দেখাতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন খরচও শিক্ষা খাতে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিকদের একটি অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। এ সময়ে অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব দেশ ছেড়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। এতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা ধর্মান্ধরা পূরণ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে অধ্যাপক মামুন বলেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার চাইলে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে পারত। তার অভিযোগ, সেসময় নিজেদের স্বার্থে ও দলীয় বিবেচনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জের বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তার বাবাকে শুধু ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাবার দুর্নাম অর্জন ছাড়া বাবার জন্য কিছুই করে নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।