রাকসু নির্বাচনের বর্ষপূর্তি আজ, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন নিয়ে যা বলছেন প্রতিনিধিরা
দীর্ঘ ৩৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা ফিরে পান তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি। নির্বাচন ঘিরে আবাসন সংকট নিরসন, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, পরিবহনব্যবস্থা, হলের খাবারের মান বৃদ্ধি ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এক বছর পর তার বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদের দাবি, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ৭৩ শতাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ থাকলেও তাদের মৌলিক সমস্যাগুলোর অনেকগুলোর সমাধান হয়নি।
২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয় পায় ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। নির্বাচনের আগে প্যানেলটি ‘১২ মাসে ২৪ সংস্কার’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অন্যদিকে, স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারের ইশতেহারেও পূর্ণাঙ্গ আবাসিকতা, হলের ডাইনিংয়ের মানোন্নয়ন, আধুনিক মেডিকেল সেন্টার ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল।
নির্বাচনের এক বছর পূর্তির আগে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ দাবি করেন, তাদের ঘোষিত ইশতেহারের ৭৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু উদ্যোগ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে, আবার কিছু কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে কোন কোন প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনগুলো আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো শুরু হয়নি—তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও অগ্রগতির পৃথক হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
রাকসুর কার্যক্রমের মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, বিভিন্ন হল ও গ্রন্থাগারে পানির ফিল্টার স্থাপন, গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, ক্যাম্পাসে ফার্মেসি চালু, নারী উদ্যোক্তা মেলা এবং গবেষণায় উৎসাহ দিতে থিসিস প্রণোদনার মতো উদ্যোগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচিও পরিচালনা করেছে রাকসু।
তবে ইশতেহারের সব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন একই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পূর্ণাঙ্গ আবাসিকতা নিশ্চিত করা, মেডিকেল সেন্টারের সেবার মানোন্নয়ন, হলের খাবারের মান বৃদ্ধি, পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশনের মতো বড় উদ্যোগগুলো নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা এখনো রয়ে গেছে।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে রাকসুর পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ বিভাগ গত ১১ ও ১২ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী হেলথ ক্যাম্পের আয়োজন করে। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এতে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী সেবা নেন। প্রায় ৪০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার এ উদ্যোগে ১৬টি বিভাগের অংশগ্রহণ, প্রায় ৭০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস বা বাসাবাড়িতে থাকতে হচ্ছে। হলের আসনসংকট, খাবারের মান ও দৈনন্দিন ব্যয় নিয়েও তাঁদের অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে এসব সমস্যার সমাধানের কথা থাকলেও এক বছরে শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রায় কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রাকসুর এক বছরের কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একাংশের মতে, দীর্ঘদিন পর নির্বাচিত ছাত্রসংসদ ফিরে আসা ইতিবাচক হলেও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
এর আগে রাকসুর কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও হলের খাবারের মানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। তার মতে, নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির ব্যবধান রয়েছে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘদিন পর ছাত্রসংসদ পুনরায় সচল হওয়ায় প্রশাসনিক কাঠামো গুছিয়ে নেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করতে সময় লেগেছে। তাই উদ্যোগগুলোর মূল্যায়নে সম্পন্ন কাজের পাশাপাশি চলমান প্রকল্প ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
রাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) এস এম সালমান সাব্বির জানান, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর নির্বাচন হওয়ায় দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বুঝে কাজ শুরু করতে কয়েক মাস সময় লেগেছে। বাজেট ও স্পনসরশিপসংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভাতা, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি এবং মেডিকেল সেবার সংস্কারের মতো বড় উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ইশতেহারের প্রায় ৭৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে তিনি তখন দাবি করেছিলেন।
রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারও এর আগে প্রশাসনিক জটিলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে রাকসুকে কার্যকর করা ছিল অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তবে শিক্ষার্থীদের কাছে এসব উদ্যোগের অগ্রগতি ও ফলাফল আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।