০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:১৮

ক্যান্টিন থেকে পরিচ্ছন্নতা—ঢাবির ৫ নারী হলে কাজ করছেন পুরুষ স্টাফ-ক্যান্টিন বয়রা

ঢাবিতে ছাত্রীদের ৫টি প্রধান আবাসিক হল রয়েছে  © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রী হলগুলোতে পুরুষ অভিভাবকদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ হলের অভ্যন্তরের ক্যান্টিন, পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন সেবামূলক কাজে অবাধে বিচরণ করছেন পুরুষ স্টাফ ও ক্যান্টিন বয়রা। এতে আবাসিক হলের মতো নিরাপদ আশ্রয়েও নারী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাফেরা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। পুরুষ কর্মীদের অস্বস্তিকর আচরণেও প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন ছাত্রীরা।
‎
‎​সাধারণত ছাত্রী হলগুলোর ক্যান্টিন ও পরিচ্ছন্নতার কাজে নারী কর্মী নিয়োগের সুযোগ থাকলেও পুরুষ কর্মীদের দিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি ছাত্রী হলে এসব করানো হচ্ছে। ক্যান্টিন পরিচালনা থেকে শুরু করে রাতে হাজিরা খাতা দেওয়া, হলের সামনের পরিচ্ছন্নতার কাজে, পেপার রুমে পত্রিকা রাখা এবং গেমস বা সংস্কৃতি চর্চা কক্ষের তালা খোলা-বন্ধ করার মতো কাজগুলো করছেন হলের পুরুষ কর্মীরা। আবাসিক হলের ভেতরে স্টাফ ও ক্যান্টিন বয়দের এই নিয়মিত যাতায়াত ঘিরেই তীব্র আপত্তি নারী শিক্ষার্থীদের। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে নারী হলগুলোতে একাধিকবার নারী স্টাফ নিয়োগের দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন ফান্ডে অযুহাত দেখানোয় এই প্রক্রিয়াটি আটকে রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের জন্য বর্তমানে মোট ৫টি প্রধান আবাসিক হল রয়েছে। এগুলো হলো- রোকেয়া হল, শামসুন নাহার হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, কুয়েত মৈত্রী হল ও সুফিয়া কামাল হল। এছাড়া কয়েকটি হোস্টেলও রয়েছে ছাত্রীদের জন্য।

নারী হলে কোনো পুরুষ কর্মীর অসদাচরণ পরিলক্ষিত হলে বা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেজন্য লিখিত অভিযোগ জমা দিতে হবে-‎​অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) 

‎‎​বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোসা. সিদ্দিকা জাহান শিফা জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৬টায় গেমস রুমের তালা খুলতে আসেন এক পুরুষ কর্মী। গেমস রুমের ঠিক পাশেই ৩৬ আসনের একটি গণরুম, রিডিং রুম এবং ওয়াশরুম। ওই কর্মী যাতায়াতের সময় সতর্কতামূলক বাঁশি না বাজানোয় ওয়াশরুম বা রিডিং রুম থেকে বের হতে গিয়ে ছাত্রীরা প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। বাঁশি বাজানোর কথা বললে ওই কর্মী উল্টো যুক্তি দেন যে, নিচ থেকে বাঁশি বাজালে শিক্ষার্থীদের ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে।

‎​এছাড়া, রাতে প্রতি ফ্লোরের লিফটের পাশে হাজিরা খাতা দিয়ে আসা, এবং তা নিয়ে যাওয়া এবং অডিটোরিয়ামে পত্রিকা দেওয়ার কাজও করেন পুরুষ কর্মীরা। নিয়ম অনুযায়ী দূর থেকে বাঁশি বাজিয়ে আসার কথা থাকলেও তারা তা মানেন না। এতে সিঁড়িতে ফোনে কথা বলা বা অডিটোরিয়ামে পড়তে বসা ছাত্রীদের, বিশেষ করে যারা পর্দা মেনে চলেন, তাদের প্রতিনিয়ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

‎​সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা। সিদ্দিকা জাহান শিফা বলেন, পুরুষ কর্মচারীরা সরাসরি মেয়েদের রুমের সামনে দিয়ে অবাধে যাতায়াত করেন। ইচ্ছা করলেই তারা ওয়াশরুম বা মেয়েদের রুমে ডিজিটাল ডিভাইস দিয়ে ভিডিও ধারণ করতে পারেন। এছাড়া যে বারান্দা দিয়ে পুরুষ কর্মচারীরা চলাচল করেন, সেখানেই দড়িতে শিক্ষার্থীদের জামাকাপড় শুকাতে দেওয়া থাকে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এর চেয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?

‎​হলের পুরুষ কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, কিছু কর্মী তাদের দিকে অস্বাভাবিকভাবে তাকিয়ে থাকেন। এমনকি পোশাক সামান্য অবিন্যস্ত হলেও আপত্তিকর দৃষ্টির শিকার হতে হয়। নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়ার কারণে সম্প্রতি এক ক্যান্টিন বয়কে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, মেয়েদের প্রত্যেকটা হলেই এটা নিয়ে সমস্যা আছে। যেসব মেয়েরা পর্দা করে তারা তো বটেই, সাধারণ নারী শিক্ষার্থীদেরও এখানে কোনো প্রাইভেসি নেই। সকালে হলের ভেতরের উঠানের মতো জায়গায় পুরুষ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঝাড়ু দেওয়ায় এবং ড্রেন পরিষ্কার করায় নিচতলার ছাত্রীদের একদম রুমের সামনেই অস্বস্তিতে পড়তে হয়। এছাড়া সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় অনবরত বাঁশি বাজানোর নির্দেশ থাকলেও অনেক কর্মী তা মানেন না; কেউ কেউ হঠাৎ মেয়েদের সামনে পড়ে যাওয়ার পর বাঁশি বাজান, ফলে ছাত্রীরা আগে থেকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ পান না।

‎নিজের সাথে ঘটা ঘটনার একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে দুপুরে আমি রুমে ঘুমাচ্ছিলাম, তখন আমার অসুস্থ রুমমেটকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসেন হলের একজন পুরুষ কর্মচারী ও একজন নারী কর্মচারী। কিন্তু পুরুষ কর্মচারী সরাসরি রুমের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার পর আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে রুমে আসবেন কি না।
‎
‎​শুধু ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলই নয়, একই চিত্র কবি সুফিয়া কামাল ও শামসুন নাহার হলেও। সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থীরা জানান, রিডিং রুম ও গণরুম এলাকায় যাতায়াতের সময় পুরুষ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বাঁশি বাজান না বা দরজায় নকও করেন না। উল্টো সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামার সময় তারা ছাত্রীদের দিকে আপত্তিকর দৃষ্টিতে তাকান। হলের গেটে দায়িত্বরত কর্মীদের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই অভিযোগ তাদের।

‎​অন্যদিকে, ‎শামসুন নাহার হলে পুরুষ কর্মীদের আনাগোনায় স্বাভাবিক চলাফেরা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানান ছাত্রীরা। ক্যান্টিনে পর্দাশীল ছাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত জায়গায় প্লেট নেওয়া বা পানি দেওয়ার সময় পুরুষ কর্মীদের হুটহাট প্রবেশে তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।

‎শামসুন নাহার হলের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাক জাহান বলেন, নারীদের হলে পুরুষ স্টাফদের আনাগোনা এমনিতেই আমাদের জন্য খুবই অস্বস্তিকর। নিজেদের মতো একটু চলাফেরা করতে পারি না। সবদিকে ছেলে মানুষ। খাবার খেতে যাই তখন ক্যান্টিন বয় রা বারবার প্লেট নিতে আসে, খুবই বিরক্ত লাগে।
‎
‎এদিকে নারী হলে পুরুষ কর্মচারী কমানোর জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভূমিকা সম্পর্কে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, নারী হলগুলোতে এখনো অনেক জায়গায় পুরুষ স্টাফরা কাজ করছে যেটি দুঃখজনক। আমরা একাধিকবার প্রশাসনের কাছে নারী স্টাফ নিয়োগের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জবাব হলো- নতুন করে স্টাফ নিয়োগ দেওয়ার মতো বাজেট বা ফান্ড তাদের নেই। তারা আমাদের উল্টো বলেছেন, আমরা যদি ফান্ডের ব্যবস্থা করে দিই, তবে তারা অস্থায়ীভাবে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
‎
‎পুরুষ কর্মচারীদের ওপর নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়গুলো জানালে কবি সুফিয়া কামাল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ছালমা নাছরীন বলেন, নারী হলে এমন কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলোর দায়িত্ব মেয়েরা নিতে পারে না। হলের ক্যান্টিনের কাজে পুরুষ ছাড়া সম্ভব নয়, এটা নারী কন্ট্রোল করতে পারে না।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তারা লিখিতভাবে দিক, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে এক লিফটম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসায় তদন্ত করে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি।
‎
‎তিনি বলেন, হল প্রশাসন নিজে থেকে তো এসবের দায় নিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি নতুন করে নারী কর্মী নিয়োগ দেয় এবং সিন্ডিকেট থেকে যদি সব নারী কর্মচারী রাখার নিয়ম পাস হয়, তখন আমরা সেটা মানব। নির্দেশ তো ওদিক থেকেই আসতে হবে।
‎
‎​এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি এ ধরনের কোনো ঘটনার বিষয়ে প্রক্টর বরাবর বা আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়, তবে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। নারী হলে কোনো পুরুষ কর্মীর অসদাচরণ পরিলক্ষিত হলে বা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেজন্য লিখিত অভিযোগ জমা দিতে হবে।