১২ দেশের গবেষকদের অংশগ্রহণে লোক প্রশাসন বিভাগের আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু
বৈশ্বিক সংকটের যুগে লোক প্রশাসনের নতুন ভাবনা, সুশাসন ও নীতিগত প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা ও মতবিনিময়ের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘লোক প্রশাসন আন্তর্জাতিক সম্মেলন-২০২৬’। সম্মেলনে ১২টি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা অংশ নিয়ে মোট ৫১টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছেন।
আজহ শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘বৈশ্বিক সংকটের যুগে লোক প্রশাসনকে নতুনভাবে ভাবা: সুশাসন ও নীতিগত প্রতিক্রিয়া’। সম্মেলন চলবে আগামীকাল রবিবার (৪ অক্টোবর) পর্যন্ত।
সম্মেলনের আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. সৈয়দা লাসনা কবিরের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, বাংলাদেশ এনার্জি নিয়ন্ত্রক কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. আকা ফিরোজ আহমেদ। সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আহমেদ শফিকুল হক এবং চীনের সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. জেং শিয়াংইউ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের ইতিহাস ও বিভিন্ন অর্জন নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সুদৃঢ় একাডেমিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বতন্ত্র ও অনন্য করে তুলতে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সর্বোচ্চ মানের কাজ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, নীতি সংস্কার, নাগরিক অধিকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণাপত্রগুলো রাষ্ট্রকাঠামোকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রূপরেখা হিসেবে কাজ করতে পারে। এই পরিবর্তনের ফলে জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসা অনিবার্য।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জন্য যেমন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। একাডেমিক ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান এগিয়ে নিতে গবেষণাখাতকে আরও সমৃদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণার মান যত ভালো হবে, দেশ তত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ এনার্জি নিয়ন্ত্রক কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বর্তমানে কোভিড-১৯ মহামারি ও অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা ধরনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে বিশ্ব। সংকটের সময়ে জনপ্রশাসনের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা। বর্তমান বাস্তবতায় জনপ্রশাসনকে জনগণের আস্থা ও সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, জনপ্রশাসন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক মাত্রাগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ক্ষমতা ও সমতার বিষয়েও কার্যকরভাবে কাজ করা প্রয়োজন। জনপ্রশাসনকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আলোচনার আওতায় আনা জরুরি। এ সময় তিনি প্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. আকা ফিরোজ আহমেদ বলেন, এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য শুধু প্রশাসন নিয়ে আলোচনা করা নয়; দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য কার্যকর জ্ঞান উৎপাদন এবং নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়াও এর অন্যতম লক্ষ্য। লোক প্রশাসন বিভাগের প্রতিষ্ঠাতারা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান ও একাডেমিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করেননি, বরং আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশাসনিক চিন্তার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি দেশের সরকারি প্রশাসনে প্রয়োজনীয় রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে একটি কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মূল্যবোধ, সভ্যতা ও আত্মত্যাগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সভাপতির বক্তব্যে লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. সৈয়দা লাসনা কবির বলেন, যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বের অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ ও মানবনিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরকারি সেবা প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে। একই সঙ্গে গোপনীয়তা, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা, অপতথ্য ও ডিজিটাল বৈষম্য নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক অংশে মেরুকরণ, জনতুষ্টিবাদ ও জনগণের আস্থা হ্রাসের কারণে গণতন্ত্রও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্ভাব্য ঝুঁকি পূর্বাভাস দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ১০টি সমান্তরাল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশনে ১২টি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মোট ৫১টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। অধিবেশনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অতিথিরাও উপস্থিত ছিলেন।