ডা. খালেদুজ্জামানের অ্যাম্বুলেন্স, ক্রেডিটবাজি ও শিবির-আম্মারের দ্বন্দ্ব
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের জন্য জামায়াত নেতা ডা. এসএম খালেদুজ্জামানের দেওয়া অ্যাম্বুলেন্সের কৃতিত্ব কার—এ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও ইসলামী ছাত্রশিবির। আম্মারের দাবি, ডা. খালেদুজ্জামানের সঙ্গে আলাপ করে এই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি, যা আসার কথা ছিল রাকসুর মাধ্যমে। কিন্তু ইসলামী ছাত্রশিবির নিজেদের ক্রেডিট নিতে সেটি ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে দেওয়া হয়েছে বলে প্রচার করেছে।
দুই পক্ষের কৃতিত্ব দাবির মধ্যেই উত্তাপ ছড়িয়েছেন সালাহউদ্দিন আম্মার ও ছাত্রশিবির নেতারা। ইতোমধ্যে আম্মারের দল থেকে বহিষ্কারের তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন শিবির নেতারা। গত বছর ‘নারীদের মধ্যে অবাধ বিচরণ, পদবাণিজ্য এবং আর্থিক অনিয়মে’র কারণে তার সাথীপদ বাতিল করা হয়, যা এই উত্তাপের মধ্যে ফাঁস হয়েছে।
এদিকে অ্যাম্বুলেন্সটির জন্য শিবিরের আগে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন বলে দাবি করছেন আম্মার। ছাত্রশিবির আগে যোগাযোগ করার প্রমাণ দিতে পারলে ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে এসব কথা জানান সালাহউদ্দিন আম্মার। একই পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, অ্যাম্বুলেন্সটি রাকসুর মাধ্যমে পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে সেটিকে শিবিরের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
পোস্টে সালাহউদ্দিন আম্মার দাবি করেন, গত ৬ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-জকসুকে একটি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার সময় চিকিৎসক এসএম খালেদুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও একটি অ্যাম্বুলেন্স ও কিছু মেডিকেল সরঞ্জাম দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। ওই চিকিৎসক তার এলাকার হওয়ায় আগে থেকেই ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ছিল বলেও জানান তিনি।
আম্মারের দাবি, ১৭ আগস্ট এসএম খালিদুজ্জামান তাকে জানান, তার স্ত্রী ও লতিফা রশিদ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের অনুমোদনে রাবির জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হবে। পরে ২১ আগস্ট ঢাকায় গিয়ে খালিদুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। সেদিনই রাবির শিক্ষার্থীরা একটি অ্যাম্বুলেন্স পেতে যাচ্ছে জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন বলেও উল্লেখ করেন আম্মার।
তিনি আরও দাবি করেন, ২১ আগস্ট রাকসুর গ্রুপে বিষয়টি জানালেও ভাইস প্রেসিডেন্ট ছাড়া অন্য কোনো সদস্যকে দাতার নাম জানাননি। বিষয়টি আপাতত কাউকে না জানানোর জন্য রাকসু ভিপিকেও অনুরোধ করেছিলেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আম্মার লিখেছেন, ‘হুট করে দেখলাম ৭ সেপ্টেম্বর শিবির ঘোষণা দিলো যে শিবিরের সভাপতি অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করেছেন।’ পরে তিনি রাকসু ভিপির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো উত্তর পাননি বলে দাবি করেন।
অ্যাম্বুলেন্সে শিবিরের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে উল্লেখ করায় আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, আপত্তি করতাম না বা চুপচাপ থাকতাম যদি এটা বলা হতো রাকসুর পক্ষ থেকে উপহার। কিন্তু এটাতে লিখেছে শিবিরের পক্ষ থেকে উপহার।
নিজের দাবির পক্ষে প্রমাণ থাকার কথা উল্লেখ করে আম্মার বলেন, রাবি শিবির সভাপতি, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন-রুয়াসহ পুরো জামায়াত এবং শিবিরকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বললাম—আমার আগে কেউ খালিদ সাহেবের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের অ্যাপ্রোচ করেছে একটা প্রমাণ দিতে পারলে আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে দিব।
তিনি আরও বলেন, অ্যাম্বুলেন্সসংক্রান্ত কোনো ফোনকল বা কথোপকথনের প্রমাণ দেখাতে পারলে তিনি তা মেনে নেবেন। এ বিষয়ে তার কাছে ‘রিয়েল টাইম কনভার্সেশন’ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে অ্যাম্বুলেন্সটি শিক্ষার্থীরা পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে আম্মার বলেন, আমি এটা নিয়ে তর্ক করতে চাই না। তবে এই অ্যাম্বুলেন্স শিক্ষার্থীরা পেয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। পোস্টে তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে তিনি আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুটি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ায় ওই অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের জরুরি সহায়তার জন্য ৩০ লাখ টাকার একটি ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি হাফেজ মেহেদী হাসান বলেন, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ইশতেহারেও মেডিকেল-সংক্রান্ত বিষয়টি ছিল। সেখান থেকেই আমাদের পক্ষ থেকে সভাপতির মাধ্যমে চিকিৎসক এসএম খালেদুজ্জামানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছিল।
তিনি বলেন, তিনি (খালেদুজ্জামান) আমাদের জানিয়েছিলেন, ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও কেউ একজন এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পরে তিনি নিজেই আমাদের সভাপতিকে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার বিষয়ে জানান। আমরা বলেছিলাম, এটি তো আমরা আগে থেকেই চাচ্ছি এবং এ বিষয়ে তার সঙ্গে আমাদের কথাবার্তাও হয়েছে।
কে আগে যোগাযোগ করেছেন, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন উল্লেখ করে মেহেদী হাসান বলেন, কে আগে যোগাযোগ করেছে বা কে আগে অ্যাপ্রোচ করেছে, সেটা আমাদের জানা নেই। আমাদের ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি নিজেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
সালাহউদ্দিন আম্মার চিকিৎসক এসএম খালিদুজ্জামানের কাছে আগে অ্যাম্বুলেন্স চেয়েছিলেন কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না, সেটা আমাদের জানা সম্ভব নয়। তার সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ বা লিংকআপ নেই।
এ বিষয়ে রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটি কে দিয়েছে, সেটি মুখ্য বিষয় নয়। শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবায় এটি কাজে লাগবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতে ইসলামী তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরকে সহযোগিতা করবে, এটা স্বাভাবিক বিষয়। পাশাপাশি সালাহউদ্দিন আম্মার যদি আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স দিতে পারেন, তাহলে সেটিও শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হবে এবং এতে তারা উপকৃত হবে।