লিয়েনে ৫ বছরের ছুটি শেষ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্ব পালনে চান আরও ৪ বছর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তূজা এর আগে পাঁচ বছর লিয়েনের ছুটি ভোগ করেছেন। এবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে (ইউল্যাব) ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আরও চার বছরের লিয়েন ছুটি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে চার বছরের জন্য এ ছুটি মঞ্জুরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার হওয়ার কথা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, একজন শিক্ষকের এমন দুইবার নেওয়ার নজির খুবই কম। বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রারও বলছেন, ‘৫ বছরের বেশি সময় লিয়েন ছুটি নেওয়ার সুযোগ নেই।’
ড. সামসাদ মর্তূজা এর আগে ইউল্যাবে অধ্যাপক ও উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য ১ আগস্ট ২০১৬ থেকে ৩১ জুলাই ২০২১ পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর লিয়েন ছুটি ভোগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, একজন শিক্ষক সর্বোচ্চ ৪ বছর পর্যন্ত লিয়েন ভোগ করতে পারেন। এর আগে এই ছুটি ৫ বছর ছিল।
জানা যায়, ড. সামসাদ মর্তূজা ২০১৫ সালের ১৫ জুন অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। এরপর ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইউল্যাবের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি পাঁচ বছর ছুটিতে ছিলেন। এ সময়ে তিনি ইউল্যাবের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এদিকে ঢাবির সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তূজাকে ইউল্যাবের ভাইস চ্যান্সেলর পদে দায়িত্ব পালনের জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে চার বছর লিয়েন (বিনা বেতনে অসাধারণ ছুটি) নেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা হবে। সংশ্লিষ্ট ওই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থের ১০ শতাংশ ওভারহেড চার্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদান সাপেক্ষে তাকে ওই পদে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিয়ম অনুসরণের নজির রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকও গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২০ সালের ৯ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গ্রিন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই অধ্যাপককে উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ দিয়ে আদেশ জারি করে। পরে তিনি লিয়েন নিয়ে ওই পদে যোগ দেন। তবে চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তার লিয়েনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রো-ভিসির পদ ছাড়তে হয় তাকে। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি ‘মিটিংয়ে রয়েছেন’ বলে জানান। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কারও কথা বলার পরামর্শ দেনি।
তবে গ্রিন ইউনিভার্সিটি সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক প্রো-ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। তবে লিয়েনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ৪ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক দায়িত্ব পেয়ে মাত্র ১০ মাস দায়িত্ব পালন করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তা চাকরিজীবনে একবারই লিয়েন ছুটি নিতে পারেন। একবারে পাঁচ বছর পর্যন্ত লিয়েন ছুটি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাঁচ বছর শেষ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে চাকরিতে যোগদান করতে হবে। এর বেশি সময় লিয়েন ছুটি নেওয়ার সুযোগ নেই।—মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ, রেজিস্ট্রার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এদিকে ইউল্যাবের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তার আরও চার বছরের ছুটির বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন অধ্যাপক সামসাদ মর্তূজা । দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘আমি লিয়েনের জন্য আবেদন করিনি। আমাকে ডেপুটেশনে চার বছরের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে যে চিঠি আছে, সেখানে চার বছরের জন্য ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ রয়েছে। আমি ওইটুকুই জানি। পরে শুনেছি, ডেপুটেশনের ক্লজ পরিবর্তন হতে পারে। এ বিষয়ে আমাকে অফিস থেকে ফোনে শুধু এতটুকুই জানানো হয়েছে। এর বেশি আমি জানি না।’
ছুটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে যে চিঠিটি আছে, সেটিতে আমাকে চার বছরের জন্য ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। আমি ২০২২ সালে যোগদান করেছি। ডেপুটেশনের চিঠি আসে ২০২৬ সালে। পরে শুনেছি, ডেপুটেশনের ক্লজ পরিবর্তন হয়েছে। তবে আমার কাছে এখনো এ-সংক্রান্ত ফাইল আসেনি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না। আমার সাথে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন যোগাযোগ নেই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছিলাম ঠিকই। তবে আমি ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রো-ভিসি ও ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ২০২২ সালে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছি। ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমি পড়িয়েছি। আমি ক্লাস নিয়েছি এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীদের সুপারভাইজ করছি।”
তিনি বলেন, “এখনো আমি পিএইচডি সুপারভাইজ করছি। চলতি সেমিস্টারেও দুটি কোর্স পড়িয়েছি। পুরো কোর্স শেষ করেছি। গত সপ্তাহে প্রশ্ন জমা দিয়ে এসেছি। আমি এখানে যোগ দেওয়ার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়েছি। আমি ৬ জন পিএইচডি শিক্ষার্থীর সুপারভাইজার। দুটি কোর্স পড়িয়েছি। সাত কলেজের চেয়ারম্যান ছিলাম। ইন্টারন্যাশনাল অফিসের পরিচালক ছিলাম। চায়না সেন্টার পরিচালনা করেছি। র্যাংকিং কমিটির কাজও করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং ৪০০ থেকে ৬০০-এর মধ্যে ওঠার পেছনেও আমি কাজ করেছি।”
যদিও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউল্যাবের দুটি সূত্রের দাবি, ইউল্যাবে উপ-উপাচার্য ও উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্যবর্তী সময়ে ‘কাগজে-কলমে’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেলেও বাস্তবে বিভিন্নভাবে ইউল্যাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তূজা। অন্যদিকে ইংরেজি বিভাগের এক স ২০১৫ সালের ১৫ জুন অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরের বছরই, অর্থাৎ ২০১৬ সালে, ইউল্যাবে যোগ দেন অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তূজা। ফলে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাঁর শিক্ষকতা জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে ইউল্যাবেই।
ঢাবির রেজিস্ট্রার অফিস সূত্র বলছে, সাধারণত কোন শিক্ষক ৪ বছরের জন্য একবারই লিয়েনে ছুটি নিয়ে থাকেন। এরপর পুনরায় আবারও ৪ বছরের ছুটি কেউ নেয় না। এমন নজির খুব কমই আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে কোন শিক্ষককে পুনরায় লিয়েনে ছুটি চাইলে বিশেষ বিবেচনায় ছুটি দিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও এই রকম ছুটির নজিরও খুবই কম।
সাধারণত কোন শিক্ষক ৪ বছরের জন্য একবারই লিয়েনে ছুটি নিয়ে থাকেন। এরপর পুনরায় আবারও ৪ বছরের ছুটি কেউ নেয় না। এমন নজির খুব কমই আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে কোন শিক্ষককে পুনরায় লিয়েনে ছুটি চাইলে বিশেষ বিবেচনায় ছুটি দিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও এই রকম ছুটির নজিরও খুবই কম।—অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভিসি (শিক্ষা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তা চাকরিজীবনে একবারই লিয়েন ছুটি নিতে পারেন। একবারে পাঁচ বছর পর্যন্ত লিয়েন ছুটি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাঁচ বছর শেষ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে চাকরিতে যোগদান করতে হবে। এর বেশি সময় লিয়েন ছুটি নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই ছুটি একসঙ্গে পাঁচ বছর না নিয়ে এক বছর করে নবায়নের মাধ্যমেও নেওয়া যায়। অর্থাৎ এক বছর করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত লিয়েন ছুটি দেওয়া যেতে পারে। ’
অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তূজার লিয়নে ছুটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে কী ধরনের ছুটি নিয়েছেন এবং বর্তমান ছুটিটি কোন বিধানের আওতায় দেওয়া হয়েছে, তা দেখে তারপর বলতে পারবো।’
যদিও একবার ছুটির পর নতুন করে ছুটি নেওয়ার বৈধতা কিংবা নজির খুব বেশি নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সাধারণত কোন শিক্ষক ৪ বছরের জন্য একবারই লিয়েনে ছুটি নিয়ে থাকেন। এরপর পুনরায় আবারও ৪ বছরের ছুটি কেউ নেয় না। এমন নজির খুব কমই আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে কোন শিক্ষককে পুনরায় লিয়েনে ছুটি চাইলে বিশেষ বিবেচনায় ছুটি দিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও এই রকম ছুটির নজিরও খুবই কম।
অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তূজার ছুটি সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রো-ভিসি বলেন, ওনার ছুটি নিয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নতুন কোন তথ্য নেই। সিন্ডিকেটে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি পরে বলতে পারবো।