২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮

পথশিশুদের হাতে খাতা-কলম, শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে ঢাবির তরী স্কুল

তরী স্কুলে ক্লাস করছেন শিক্ষার্থীরা  © টিডিসি ফটো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল প্রাঙ্গণে গেলেই দেখা যায় চারপাশে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা। এর মাঝেই খাতা-কলম হাতে একদল শিশুকে ঘিরে বসেছেন কয়েকজন তরুণ-তরুণী। কেউ অক্ষর চিনছে, কেউ পড়া লিখছে, আবার কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনছে শিক্ষকের কথা। ক্লাস শেষে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষা উপকরণ, সঙ্গে থাকছে পুষ্টিকর নাস্তা।

এ দৃশ্য এখন অনেকটাই পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায়। শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকা শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নিয়মিত এমন পাঠশালার আয়োজন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তাদের এই উদ্যোগের নাম তরী স্কুল।

মানবিকতা ও স্বেচ্ছাসেবার ভাবনা থেকে গড়ে ওঠা তরী স্কুলের মূল লক্ষ্য শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকা শিশুদের একাডেমিক সহায়তা দেওয়া এবং তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা।

যেভাবে শুরু
২০২৬ সালের ৩ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে তরী স্কুলের পথচলা শুরু হয়। তবে এই উদ্যোগের ধারণাটি প্রথমে শুরু হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে থাকা পথশিশুদের কথা চিন্তা করে ঢাবির শিক্ষার্থীরাও একই ধরনের উদ্যোগ শুরু করেন।

শুরুতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে অংশগ্রহণ। বর্তমানে ৬০টির বেশি শিশুকে নিয়ে কাজ করছে তরী স্কুল। আর শিশুদের পাশে দাঁড়াতে যুক্ত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪০ জনের বেশি স্বেচ্ছাসেবী। তাদের মধ্যে ১০০ জনের বেশি নারী ও ৪০ জনের বেশি পুরুষ।

সপ্তাহে দুই দিন বসে পাঠশালা
প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার ও শনিবার চলে তরী স্কুলের কার্যক্রম। প্রতি মাসে আয়োজন করা হয় ৮টি রেগুলার ক্লাস এবং ৮টি এডুকেশন ক্যাম্প। কার্জন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত রেগুলার ক্লাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সন্তানদের হোমওয়ার্ক সাপোর্ট ও একাডেমিক সহায়তা দেওয়া হয়।

আবার এডুকেশন ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও কার্জন প্রাঙ্গণে। সেখানে পথশিশুদের পাঠদানের পাশাপাশি তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় খাতা, কলমসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। ক্লাস শেষে থাকে নাস্তার ব্যবস্থাও। শিশুদের ক্লাসে আগ্রহী করে তুলতেও নানা উদ্যোগ নেন স্বেচ্ছাসেবীরা। নিজেদের অর্থায়নে শিক্ষা উপকরণ ও নাস্তার ব্যবস্থা করে তারা শিশুদের নিয়মিত ক্লাসে আসতে উৎসাহিত করছেন।

মানবতাই বড় ধর্ম
তরী স্কুলের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, তাদের কাজের মূল প্রেরণা মানবিকতা। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে চান তারা।

তাদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করছে না, স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যেও গড়ে তুলছে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা একই উদ্দেশ্যে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

আরও দেখুন: দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা, অগ্রগতি না হলে শাহবাগে ফের অবস্থান নেবেন নিয়োগপত্র বঞ্চিতরা

শিশুদের কাছ থেকে পাওয়া সাড়াও তাদের উৎসাহিত করছে। শুরুতে শিক্ষার্থী কম থাকলেও বর্তমানে শিশুদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ফলে স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যেও কাজের আগ্রহ বাড়ছে।

কারও হাতে প্রথম অক্ষর
তরী স্কুলের স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে সবচেয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হলো শিশুদের শেখার প্রথম ধাপের সঙ্গী হতে পারা। অনেক পথশিশু হয়তো এর আগে নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পায়নি। তাদের কেউ কেউ তরী স্কুলে এসে প্রথমবারের মতো অক্ষর চিনছে, খাতা-কলম নিয়ে বসছে, পড়াশোনার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।

একটি শিশুর হাতে প্রথম অক্ষর তুলে দেওয়ার এই মুহূর্তকে স্বেচ্ছাসেবীরা দেখছেন অন্যরকম অনুভূতি হিসেবে। তাদের কাছে এটি শুধু একটি ক্লাস নেওয়া নয়; বরং কোনো শিশুর জীবনে শিক্ষার প্রথম দরজাটি খুলে দেওয়ার সুযোগ।

নিজেদের সামর্থ্যেই এগিয়ে চলা
তরী স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে। স্বেচ্ছাসেবীরাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাতা-কলম, শিক্ষা উপকরণ ও নাস্তার ব্যবস্থা করছেন।

কোনো বড় আয়োজন বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের উদ্যোগেই চলছে এই কার্যক্রম। একজনের ছোট অবদান আরেকজনের সহযোগিতার সঙ্গে মিলেই তৈরি হচ্ছে শিশুদের জন্য একটি নিয়মিত পাঠশালা।

ছোট্ট তরী, বড় স্বপ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত ক্যাম্পাসের এক পাশে যখন ক্লাসে ব্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, তখন অন্য পাশে হয়তো কোনো পথশিশু প্রথমবারের মতো খাতায় নিজের নাম লিখতে শিখছে। কারও হাতে প্রথম অক্ষর, কারও হাতে প্রথম বই-খাতা—এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে তরী স্কুল।

৩ জুলাই শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন ৬০টির বেশি শিশুকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলছে। পাশে রয়েছে ১৪০ জনের বেশি স্বেচ্ছাসেবী। তাদের পথচলা হয়তো এখনো ছোট। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে তরী স্কুলের যাত্রা শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকা শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া সেই স্বপ্নের পরিধি অনেক বড়।

একটি খাতা, একটি কলম, একটি ক্লাস হয়তো বদলে দেবে একটি শিশুর ভবিষ্যতের গল্প। আর সেই গল্প লেখার কাজে নিজেদের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তাদের এই ছোট্ট উদ্যোগের নাম তরী স্কুল।