ক্যাম্পাসে মব, ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করলেন হার্ভার্ড পড়ুয়া ঢাবির সাবেক ছাত্রী এ আর তাহসিন
মব দ্বারা হেনস্তার প্রতিবাদে ডিনস অ্যাওয়ার্ড পেয়েও প্রত্যাখান করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এ. আর. তাহসিন জাহান। নিজের বিভাগে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করায় ঢাবির ডীনস অ্যাওয়ার্ড মনোনীত হলেও শেষপর্যন্ত মবের স্বীকার হওয়া এবং প্রশাসনের কাছ থেকে অভিযোগের পরও কোন প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে অ্যাওয়ার্ড না নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরীফায়েড ফেসবুক একাউন্টে এক পোস্টে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান তাহসিন জাহান।
তিনি লেখেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চার বছরের স্নাতকজীবনের শুরু থেকেই আজকের দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছি। অসংখ্য নির্ঘুম রাত, চার বছরের কঠোর পরিশ্রম আর নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার পর নিজ বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে আজ আমার ডিনস অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু আমি সেই ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করেছি। যারা এই পুরস্কারটির সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জন্য বলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে স্নাতক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য ডিনস অ্যাওয়ার্ড অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্বীকৃতি। একসময় যে পুরস্কারটি অর্জনের জন্য এতটা পরিশ্রম করেছি, আজ সেটিই প্রত্যাখ্যান করা আমার জন্য সহজ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘কিন্তু কোনো পুরস্কারের মর্যাদা আমার কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়।এই পুরস্কার গ্রহণ করার অর্থ হতো এমন একটি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি উদযাপন করা, যে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন নিজেদের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তাদের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করেনি ‘
তার অভিযোগ, ‘২০২৪ সালে শুধুমাত্র আমার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আমি মবের আক্রমণের শিকার হয়েছিলাম। কোনো ধরনের সহিংসতার সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও নিজের বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই হুমকির মুখে পড়েছিলাম। আমাকে ফাইনাল ভাইভায় অংশ নিতে এবং স্নাতক থিসিস জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। নিজের শারীরিক নিরাপত্তার জন্য একটা সময়ের পর ক্যাম্পাসেও ফিরতে পারিনি। সেই সময় আমার বিভাগের কিছু শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস দেখিয়েছিলেন। তাদের কারণেই শেষ পর্যন্ত নিরাপদ জায়গা থেকে অনলাইনে ফাইনাল ভাইভায় অংশ নিয়ে আমার স্নাতক শেষ করতে পেরেছিলাম। তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা এবং শ্রদ্ধা সবসময় থাকবে। (না, আপনাদের তথাকথিত নৈতিকতার মুখোশধারী ‘শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ নয়।)’
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষাজীবন ব্যাহত করার অভিযোগ তুলে তিনি আরও লেখেন, ‘আমার শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা সত্ত্বেও আমি ভাগ্যবান ছিলাম যে শেষ পর্যন্ত ঢাবিতে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে পেরেছি এবং হার্ভার্ডে এসে নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মতো ১০,০০০-এরও বেশি শিক্ষার্থী সেই সুযোগ পায়নি। প্রশাসন নীরব থেকেছে এবং মৌলবাদী মবকে নীরবে সমর্থন করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। এমনকি কারাগারে থাকা সবচেয়ে গুরুতর অপরাধীরও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রয়েছে। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন নিজেদের শিক্ষার্থীদের সেই অধিকার রক্ষায় কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নেয়নি। বরং তোফাজ্জল, মাসুদ ও শামীমসহ আরও অনেক নিরপরাধ মানুষের রক্তের দায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেও রয়েছে ‘
দেশের বর্তমান সরকারের আমলে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার হওয়া নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ‘সরকার পতনের পর যদি সত্যিই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে এই হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখনো কেন নিজেদের ক্লাসরুমে ফিরতে পারছে না? এখন অজুহাতটা কী? যেসব শিক্ষক আমাকে এত দূর আসতে সাহায্য করেছেন, তাঁদের প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা। আমার অর্জনের পেছনে তাঁদের অবদান রয়েছে এবং সেই কৃতিত্ব তাঁদের প্রাপ্য। কিন্তু তাঁদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যে প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তাদের পাশে দাঁড়ায়নি, সেই প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার গ্রহণ করে আমি নিজের অর্জন উদযাপন করতে পারি না।’
তিনি আরও জানান, ‘এই সিদ্ধান্ত কোনো পুরস্কারকে ছোট করার জন্য নয়। বরং সেই সহপাঠীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, যাদের অপরাধ শুধু তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, অথচ তার মূল্য তারা দিয়েছেন নিজেদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ দিয়ে। ন্যায়বিচার যদি সবার জন্য না হয়, তবে সেটি ন্যায়বিচার নয়। আর দয়া করে আমাদের বলবেন না, ‘আমরাই বিকল্প, আমরাই পরিবর্তন।’ কারণ অন্যায়ের পরিবর্তে আরেকটি অন্যায় কখনো বিকল্প হতে পারে না।’
জানা গেছে, ২০১৯-২০২০ সেশনে ঢাবির ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের শিক্ষার্থী এ. আর তাহসিন জাহান স্নাতকে ৪ এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯৫ সিজিপিএ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। বর্তমানে বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক পলিসিতে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন তিনি।