ভুল রিপোর্টের অভিযোগে জাবি মেডিকেলে শিক্ষার্থীদের তালা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মেডিকেল সেন্টারের প্যাথলজি মেশিনে ত্রুটি থাকার পরও বিষয়টি শিক্ষার্থীদের না জানিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মেডিকেল সেন্টারের অফিসে তালা দিয়েছেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে মেডিকেল সেন্টারের অফিসের গেটে তালা দেন তারা।
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. রাশেদ শেখ দীর্ঘদিন ধরে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। চিকিৎসার নিয়মিত অংশ হিসেবে তিনি জাবি মেডিকেল সেন্টারে রক্ত পরীক্ষা করান। গত আগস্টে করা পরীক্ষার রিপোর্টে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১৫ দশমিক ৭ উল্লেখ করা হয়। রিপোর্টটি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে সাভারের ইবনে সিনা মেডিকেলে আবার পরীক্ষা করান তিনি। সেখানে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পাওয়া যায় ৮ দশমিক ৮।
রাশেদ শেখ বলেন, ‘বিগত ১০-১১ বছরে আমার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কখনো ১০ বা ১১-এর ওপরে ওঠেনি। অথচ জাবি মেডিকেলের রিপোর্টে ১৫ দশমিক ৭ দেখানো হয়েছে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ইবনে সিনায় পুনরায় পরীক্ষা করালে প্রকৃত মাত্রা ৮ দশমিক ৮ আসে।’
তিনি বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়ার কারণে আমাকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। ভুল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে যদি ওষুধ বন্ধ করে দিতাম, তাহলে হিমোগ্লোবিন আরও কমে গিয়ে জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারত। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলায় এত দিন বিষয়টি নিয়ে মেডিকেলে আসতে পারিনি। পরীক্ষা শেষে আজ প্রক্টর স্যার ও সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়ে জবাবদিহিতা চাইতে এসেছি।’
রাশেদের সহপাঠী মো. নাইমুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বন্ধু জাবি মেডিকেলে থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্টে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১৫-এর ওপরে আসে। অথচ তার স্বাভাবিক মাত্রা কখনোই এত বেশি ছিল না। পরে অন্য হাসপাতালে পরীক্ষা করালে রিপোর্টের সঙ্গে অসংগতি ধরা পড়ে।’
আরও পড়ুন: নোবিপ্রবিতে ২ কোটি টাকায় নির্মিত খেলার মাঠে খেলতে পারেন না শিক্ষার্থীরা
তবে রিপোর্টের অসংগতিকে প্যাথলজি মেশিনের কারিগরি ত্রুটি বলে জানিয়েছেন মেডিকেল সেন্টারের টেকনিক্যাল কর্মকর্তা মো. নাইমুল ইসলাম ও কে এম নাজমুল হোসেন। তারা বলেন, ‘পরীক্ষার সময় প্যাথলজি মেশিনে সমস্যা চলছিল। নতুন মাদারবোর্ড লাগানোর পর কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরে মেশিনের রিডিংয়ে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। মূলত ১০ ও ১১ তারিখে দুই দিনের জন্য এ সমস্যা হয়েছিল।’
মেশিনের ত্রুটি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত না করার বিষয়ে তারা বলেন, ‘বিষয়টি চিফ মেডিকেল অফিসার (সিএমও), উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। দ্রুত মেরামতের জন্যও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।’
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা। ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানজির রহমান হিমেল বলেন, ‘মেশিন নষ্ট হওয়ার বিষয়টি আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো উচিত ছিল। মেশিন মেরামতে যদি তিন লাখ টাকা ব্যয় করা হয়ে থাকে, তাহলে এটি কখন থেকে অকার্যকর ছিল এবং এর মধ্যে কতজনকে ভুল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা হলে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি।’
মেডিকেল সেন্টারের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মো. শামসুল আলম খান বলেন, ‘আমি যখন জানতে পারি মেশিনটি নষ্ট হয়েছে, তখন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সোহেল রানার সঙ্গে আলোচনা করি। দ্রুত মেশিনের ত্রুটি সমাধানের জন্য নতুন মাদারবোর্ড কিনে মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
রিপোর্টের ত্রুটি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, এ ঘটনায় প্রকৃতভাবে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হবে।
পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, প্রক্টর অধ্যাপক জাকির হোসেন, সহকারী প্রক্টর আব্দুস সাত্তারসহ মেডিকেল সেন্টারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে মেডিকেল সেন্টারের অফিসের তালা খুলে দেওয়া হয়।