ঢাবির কার্জন হলে অনুষ্ঠিত হলো ম্যাথক্যুয়েস্ট জিনিয়াস হান্ট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক কার্জন হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে তরুণ-নেতৃত্বাধীন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম ম্যাথক্যুয়েস্টের ফ্ল্যাগশিপ আয়োজন ম্যাথক্যুয়েস্ট জিনিয়াস হান্ট। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী এ আয়োজনে গণিত, যুক্তি, বিশ্লেষণী দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, একাগ্রতা ও কৌশলগত চিন্তাশক্তি যাচাইয়ে চারটি বিভাগে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।
আইসিটি বিভাগ, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, ডিইআইইডি (ডিইআইইডি) এবং দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সার্বিক সহায়তায় এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
বিকেল সোয়া ৫টায় শুরু হওয়া পুরস্কার বিতরণী পর্ব আনভেইলিং দ্য কনকোয়েরার্সে চারটি বিভাগের বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে সনদ ও পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পরে বিকেল ৬টায় দ্য ফাইনাল ফ্রেম পর্বের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
ম্যাথক্যুয়েস্ট বাংলাদেশের স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাণিতিক স্বাক্ষরতা, যৌক্তিক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ ও অলিম্পিয়াড উৎসাহীদের সমন্বয়ে গঠিত এ প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের কাছে মানসম্মত গণিত শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল ও যুক্তিনির্ভর সমস্যা-সমাধানকারী হিসেবে গড়ে তোলা।
আয়োজকরা জানান, ম্যাথক্যুয়েস্ট জিনিয়াস হান্টে শিক্ষার্থীদের শুধু মুখস্থবিদ্যার ওপর নয়, বরং বিশ্লেষণী দক্ষতা, সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, একাগ্রতা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিযোগিতায় ছিল পাঁচটি স্বতন্ত্র সেগমেন্ট। এগুলো হলো যৌক্তিক বিশ্লেষণধর্মী অ্যানালিটিকা, গাণিতিক সমস্যা সমাধানভিত্তিক ম্যাথ অলিম্পিয়াড, যুক্তি ও প্যাটার্ন-নির্ভর গ্রিড উইথ লজিক (সুডোকু), গতি ও নির্ভুলতার পরীক্ষা দ্য কিউবিক অ্যান্ড টুইস্ট (রুবিক্স কিউব চ্যালেঞ্জ) এবং ইন্টিগ্রেশন কৌশলনির্ভর ইন্টিগ্রেশন বি।
প্রাইমারি, জুনিয়র, ইন্টারমিডিয়েট ও সিনিয়র এই চারটি বিভাগে ভাগ হয়ে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।
সকাল সাড়ে ৮টায় এন্ট্রি পাস ও যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজনের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হয় ম্যাথ অলিম্পিয়াড, ইন্টিগ্রেশন বি-এর প্রথম রাউন্ড, গ্রিড উইথ লজিক এবং দ্য কিউবিক অ্যান্ড টুইস্ট প্রতিযোগিতা।
সকাল সাড়ে ৯টায় প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম। তিনি অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. মো. শহীদুল ইসলাম আয়োজনটিকে গণিতের খেলা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা থেকে সরে এসে যুক্তি, চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের বিকেলে থটস ফ্রম আওয়ার অনারেবল গেস্টস পর্বে অতিথিরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান। তিনি বাস্তবজীবনে গণিতের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গাণিতিক চিন্তাভাবনার প্রয়োগ সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের ধারণা দেন।
এরপর বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক এপিএস ও ইনিশিয়েটিভ ফর বেটার বাংলাদেশের পরিচালক নাজমুস সাদাত পারভেজ। তিনি ক্রিটিক্যাল থিংকিং নিয়ে আলোচনা করেন এবং শিক্ষার্থীদের যুক্তিনির্ভর ও বিশ্লেষণধর্মী মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
আরও দেখুন: শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা উচিত
পরে বক্তব্য দেন মাধ্যমিক গণিত পাঠ্যবই, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) লেখক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিভাগের অনুষদ সদস্য সকাল রায়। তিনি শূন্য নাকি জিরো কোনটি আগে এসেছে এমন চমকপ্রদ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেন। তার বক্তব্য উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে।
এরপর বক্তব্য দেন টিইএমএস একাডেমি অব অলিম্পিয়াড ম্যাথ অ্যান্ড সায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা মো. রেজাউল ইসলাম। তিনি অলিম্পিয়াডে ভালো করার কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। ফলাফল বা পুরস্কারের চেয়ে নিজের প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন।
পরে শিক্ষার্থীদের গাণিতিক ও যৌক্তিক চিন্তাভাবনার বিকাশে অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম।
পুরস্কার বিতরণী পর্বের পর বক্তব্য দেন ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড ইনোভেশন ইকোসিস্টেম ডেভেলপমেন্টের (ডিইআইইডি) প্রকল্প পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। তিনি আইসিটি বিভাগ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন এ প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছেন।
তিনি জীবনমুখী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনটি শব্দে পরামর্শ দেন যুক্তি, নীতি ও বোধ। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে একটি অনুপ্রেরণামূলক গান গেয়ে শোনান। এতে পুরো আয়োজনে ভিন্নমাত্রার আবহ তৈরি হয়।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, ম্যাথক্যুয়েস্ট জিনিয়াস হান্ট এর মতো আয়োজনের মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যৌক্তিক, সৃজনশীল ও গাণিতিক চিন্তাভাবনার চর্চা আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত গণিতচর্চায় উৎসাহিত হবে।