কবি নজরুলকে নিয়ে লেখা ৯৭ বছরের পুরোনো মানপত্রটি এখন চবিতে
দিনপঞ্জিকার পাতায় সময় তখন ১৯২৯ সালের ২১ জানুয়ারি। ৯৭ বছর আগে চট্টগ্রামের কাট্টলীতে এক অনুষ্ঠানে এসেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তখন কবির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল একটি ভালোবাসা পূর্ণ এক মানপত্র। সেই মানপত্রের পাতায় লেখা ছিল তাকে নিয়ে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর প্রত্যাশার কথা। সেই মানপত্রের প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠেছিল তরুণ কবি নজরুলকে ঘিরে চট্টগ্রামের মানুষের মুগ্ধতা।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বেলা ৪টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. ফরিদুদ্দিন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চট্টগ্রাম আগমনকে কেন্দ্র করে ১৯২৯ সালে দেওয়া এক সংবর্ধনাপত্র নিয়ে আলাপ করেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে। তিনি ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন সেই ঐতিহাসিক মানপত্রটি দলিল হিসেবে এখন চবির নজরুল গবেষণা কেন্দ্রে সংরক্ষিত রয়েছে।
চবি অধ্যাপক ড. ফরিদুদ্দিন বলেন, ‘নজরুল যখন দ্বিতীয়বার চট্টগ্রাম নগরীতে আসেন, তখন তিনি কাট্টলী ক্লাবে গিয়েছিলেন। সে সময় কাট্টলী ইউনিয়ন ক্লাব ছিল চট্টগ্রামের অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এই ক্লাবের সভাপতি ছিলেন মাওলানা তমিজুর রহমান, যিনি অনুবাদ সাহিত্যে ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের একজন ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবালের রচনাকে তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। নজরুলকে অভ্যর্থনা জানাতেই মাওলানা তমিজুর রহমান তার উদ্দেশে সেই ঐতিহাসিক মানপত্রটি রচনা করেছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামের তৎকালীন বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক মহলে যেসব কবি-সাহিত্যিকের ব্যাপক প্রভাব ছিল, মাওলানা তমিজুর রহমান স্বরচিত মানপত্রে তাদের প্রায় সবাইকে তুলে এনেছেন। একই সাথে তাদের সঙ্গে নজরুলের তুলনা করে তার সাহিত্যিক প্রতিভা ও স্বাতন্ত্র্যকে তুলে ধরেছেন।’
চবির নজরুল গবেষণা কেন্দ্রে মানপত্রটি সংগ্রহের বিষয়ে এ অধ্যাপক বলেন, দীর্ঘদিন পর ২০২৬ সালের ৪ জুলাই এক তরুণ গবেষক মোহাম্মদ বশীর উল্লাহ, যিনি শামস সাইমুম নামে পরিচিত। তার মাধ্যমে আমরা কাট্টলী ইউনিয়ন ক্লাব থেকে এই ঐতিহাসিক মানপত্রটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। এ জন্য শামস সাইমুমকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে এই ঐতিহাসিক দলিলটি সংরক্ষণ করে রাখার জন্য কাট্টলী ইউনিয়ন ক্লাবকেও কৃতজ্ঞতা জানাই।
মানপত্রে নজরুলকে ‘অগ্নি-কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি
চট্টগ্রামের কাট্টলীতে কবি নজরুল ইসলাম যেদিন আগমন করেছিলেন সেই ১৯২৯ সালের ২১ জানুয়ারি ছিল মাঘের শীতল বিকেল। সেই হালকা ঠান্ডা পরিবেশে কবিকে বরণ করতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠেছিল পুরো এলাকা। দুপুরের পর থেকেই তৎকালীন কর্নেল হাট চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে কবিকে একনজর দেখতে, তার বক্তব্য শুনতে এবং কবির কণ্ঠে কবিতা, গান ও গজল উপভোগ করতে।
কাট্টলীর সেই সংবর্ধনায় মানপত্র পাঠের শুরুতেই নজরুলকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘অগ্নি-কবি’ হিসেবে। কবির সাহিত্য, প্রতিভা, বিদ্রোহী চেতনা এবং মানবতাবাদী দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ফুটে ওঠে এতে। এছাড়া
মানপত্রে নজরুলকে বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল প্রতিভা হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়, তার কবিতা ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে তিনি মানুষের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে পারেন। একই সঙ্গে কবির প্রতি কাট্টলীর মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশও ঘটেছে পুরো মানপত্রজুড়ে।
‘অগ্নি–কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের খায়রে–মকদম উপলক্ষ্যে
আজ আমাদের গুল্ শনেতে ফুল ফুটেছে শীতের কালে,
অগ্নিবীণার বুল্ বুলিটী গাইবে
গযল ডালে ডালে।
আয়রে দয়েল, আয় পাপিয়া,
ভক্তি গুলের হার গাঁথিয়া,
আগমনীর নায্ রানা দে,
বিশ্ব–কবি নজরুল গলে,
গরীর দেশে আর কি আছে
তোহ্ফা দিতে চরণ তলে।
আয়রে কবি, বঙ্গ–রবি,
আঁকিয়ে দে তোর রক্ত–ছবি,
বিশ্বজোরা কীত্তি তোমার
থাকুক লিখা যুগের তালে,
হিংসা–অনল দগ্ধীভূত
করুক তোমার শত্রু দলে।
উরফি তুমি, ছাদি তুমি,
জামি ও ফেরদৌছি তুমি,
আনওয়ারী, খাকানী তুমি,
ঘোষবে জগৎ কালে কালে।
বঙ্গদেশে জন্মেছিলে
বাঙালীদের ভাগ্যফলে।
সর্ব্বহারা জাতি মোরা,
হিংসা দ্বেষে দেলটী ভরা,
গুনের আদর করতে জানে
কয়জন আছে মোদের দলে
তাইত এই বিশাল জাতি
যাচ্ছে ক্রমে রসাতলে।
তুমি কবি ভাবের আকর,
ভাবগুলিত তোমার চাকর,
অনায়াসে ভাবের ধারা
আনতে পার এমন ছলে,
দোশ্ মনেরাও দোস্ত হয়ে
নাচে যেমন তোমার তালে।
ধ্বংস পথের যাত্রী মোরা,
তরক্কি পথ চাই আমরা,
তুমি পার কাব্য ছলে
পথ দেখাতে সর্ব্ব–দলে
বিশ্ব–প্রেমের কীত্তি যেন
বজায় থাকে ধরাতলে।
প্রসঙ্গত, মানপত্রটি পাঠের সময় পাঠকের দিকে বার বার তাকাচ্ছিলেন কবি নজরুল। এক পর্যায়ে মানপত্রের লেখক ও পাঠক মাওলানা তমিজুর রহমানকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর কবির গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেয়া হয় এবং মানপত্রটি হাতে তুলে দেয়া হয়।