জুলাই বিপ্লবের স্মরণে গল্প-উপন্যাস লিখে ডাকসুর পুরস্কার পেলেন ২০ শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে আয়োজিত জুলাই বিপ্লব স্মরণে ‘ডাকসু জাতীয় গল্প ও উপন্যাস প্রতিযোগিতা-২০২৬’- এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জুলাই শহীদ স্মৃতি ভবন অডিটোরিয়ামে এ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারীকে ২৫ হাজার টাকার সমমূল্যের বই, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীকে অর্জনকারীকে ২০ হাজার টাকার সমমূল্যের বই, তৃতীয় স্থান অর্জনকারীকে ১৫ হাজার টাকার সমমূল্যের বই, চতুর্থ স্থান অর্জনকারীকে ১০ হাজার টাকার সমমূল্যের বই, পঞ্চম স্থান অর্জনকারীকে ৫ হাজার টাকার সমমূল্যের বই, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম স্থান অর্জনকারীকে ২ হাজার টাকার সমমূল্যের বই, নবম থেকে বিশতম স্থান অর্জনকারীকে ১ হাজার টাকার সমমূল্যের বই সহ সম্মাননা ক্রেস্ট ও সন পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা হয়।
ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, জুলাই বিপ্লবের সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ বা বয়ান নির্মাণের জন্য যে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন ছিল, ডাকসু থেকে তা ইতিপূর্বে নেওয়া হয়নি। বিগত ১৬-১৭ বছর কিংবা তার আগের সময়গুলোতে যাঁরা শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যিক বয়ানের নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই ছিলেন সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের দোসর। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত কয়েক শতকে এই উপমহাদেশে সাহিত্য চর্চার মূল পৃষ্ঠপোষকতা এসেছে হিন্দু জমিদারদের কাছ থেকে। সে সময়ে এ অঞ্চলে মুসলিম জমিদারদের সংখ্যা নগণ্য থাকায় মুসলিম সাহিত্যিকরা পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ পাননি বললেই চলে। ফলে ব্রিটিশ শাসনের পর থেকে বিগত দুই-তিনশত বছরে সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব জীবনচিত্র বা স্বকীয় কথা তেমনভাবে উঠে আসেনি। তবে আজ থেকে পাঁচ-ছয়শত বছর পূর্বে মধ্যযুগের দিকে তাকালে দেখা যায়—শাহ মুহম্মদ সগীর কিংবা আলাওলের মতো বহু সাহিত্যিক বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন, যেখানে তৎকালীন বাংলাভাষী মুসলিম সমাজ ও সামগ্রিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
তিনি বলেন, পরবর্তী তিন-চার শতাব্দীতে এই জায়গায় এক বড় শূন্যতা তৈরি হয়। আর গত ১৬-১৭ বছরে একটি ফ্যাসিবাদী চক্র এই সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেছে। এই সামগ্রিক ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পার্শ্ববর্তী দেশের শহরকেন্দ্রিক প্রভাববলয় ভেঙে বলয়মুক্ত ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন সাংস্কৃতিক ধারা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ঘটেছিল। এই তাড়না থেকেই ছাত্র-জনতা এক হয়ে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই—বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজধানী অন্য দেশের কোনো শহর কিংবা দূর থেকে পরিচালিত হবে না; এর একমাত্র কেন্দ্র হবে ঢাকা। ঢাকাই নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূল ধারা।
তিনি আরও বলেন, সেই চেতনা থেকেই জুলাই বিপ্লবকে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে রূপ দেওয়া এবং এর বয়ানকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। এ উদ্দেশ্যেই আমরা গল্প ও উপন্যাস সংগ্রহের উদ্যোগ নিই এবং সর্বস্তরের মানুষ—শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। সংগৃহীত প্রায় এক হাজার লেখার মধ্য থেকে বাছাইকৃত ২৯টি গল্প নিয়ে একটি সংকলন এবং ৯টি আলাদা উপন্যাস প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল ডাকসুতে এগুলোর মোড়ক উন্মোচিত হবে। এর মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে শক্তিশালী সাহিত্য ভিত্তি রচিত হলো, যা আগামী বহু দশক বা শতাব্দী ধরে গবেষণার খোরাক জোগাবে। আমরা যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, রিজিয়া রহমান কিংবা সেলিনা হোসেনের সাহিত্য পর্যালোচনা করে মুক্তিযুদ্ধকে বোঝার চেষ্টা করি; ঠিক তেমনি ভবিষ্যতেও মানুষ ডাকসুর সংকলিত এসব সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের সঠিক ইতিহাস ও চেতনাকে অনুধাবন করতে পারবে।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ডাকসুর মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এই মেয়াদের মধ্যে আমরা ডাকসুর নেতৃবৃন্দ প্রতিটি বিভাগ ও ক্ষেত্রে কাজ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সেই ধারাবাহিকতায় আজ ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক একটি ঐতিহাসিক ও জাতির জন্য অত্যন্ত জরুরি উদ্যোগ নিয়েছেন। জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী জুলাই জাদুঘর নির্মাণ করেছেন, যা নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ ছিল। তবে এর বাইরে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বেগবান করার মতো দৃশ্যমান উদ্যোগ তেমন একটা চোখে পড়েনি। সেই দিক থেকে মুসাদ্দেকের এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তিনি আরও বলেন, ডাকসুর পক্ষ থেকে আমরা যে বইগুলো প্রকাশ করতে যাচ্ছি এবং এতে যাঁরা লেখালেখি করেছেন; তাঁরা যদি চর্চার এই ধারা অব্যাহত রাখেন, তবে আজ থেকে কয়েক দশক বা শত বছর পর বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাঙালি মুসলমানের যে দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি ও ঘাটতি রয়েছে, তা কেটে যাবে। আজকে যাঁরা গল্প জমা দিয়েছেন কিংবা বিজয়ী হয়েছেন, তাঁদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে বড় বড় সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটবে। এর মাধ্যমে সাহিত্য অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে থাকা কালচারাল ফ্যাসিস্ট চক্রের আধিপত্য বলয় ভেঙে পড়বে এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে একটি নতুন ধারার প্রতিষ্ঠা ঘটবে।
প্রতিযোগিতার সহ-আয়োজক ও স্মারকগ্রন্থের সহ সম্পাদক রিয়াদুল ইসলাম যুবার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর আইন সম্পাদক শাখাওয়াত জাকারিয়া, ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, সাইমুম ফেরদৌস, রিজওয়ান জুবায়ের মনসুরী, আশফাকুল্লা আসিফ, হল সংসদের নেতৃবৃন্দ সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।