০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১২

নিয়ম লঙ্ঘন করে ছেলের ভর্তি পরীক্ষায় পরিদর্শকের দায়িত্বে শিক্ষক বাবা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো  © টিডিসি সম্পাদিত ও সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় নিজের ছেলের হলে দায়িত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক শিক্ষক বাবা। শুধু তা-ই নয়, ছেলের ব্যবহারিক পরীক্ষার গ্রুপেও পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক বা তার নিকটাত্মীয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার কথা। তবে ওই শিক্ষক তা করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগটি উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহা. মুনিরুল হকের বিরুদ্ধে। তার ছেলে আব্দুল্লাহ জুবায়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। লিখিত পরীক্ষায় ৪৭ নম্বর পেয়ে মেধাক্রমে ৩ হাজার ২৫৫তম হলেও পরে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ৩১ নম্বর পান তিনি। সব মিলিয়ে ৭৮ নম্বর পেয়ে নিজ গ্রুপে অষ্টম হয়ে ভর্তির সুযোগ পান। ভর্তি পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট একাধিক নথি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ ইউনিটে ১ হাজার ৫৩৬টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেন ১ লাখ ২৬ হাজার ২২৫ জন। অর্থাৎ প্রতিটি আসনের জন্য প্রায় ৮২ জন শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

ভর্তি পরীক্ষা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ‘সি’ ইউনিটের কো-অর্ডিনেশন কমিটির কো-অর্ডিনেটর এবং ব্যবহারিক অংশের পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন অধ্যাপক মোহা. মুনিরুল হক। শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের ব্যবহারিক পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির ১১ সদস্যেরও একজন তিনি। এ ছাড়া ২ ও ৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত তিনটি গ্রুপের ব্যবহারিক পরীক্ষায় তিনি পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে তার ছেলে আব্দুল্লাহ জুবায়ের যে গ্রুপে পরীক্ষা দেন, সেই গ্রুপেও তিনি পরিদর্শক ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষকের সন্তান বা নিকটাত্মীয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলে বিষয়টি লিখিতভাবে কো-অর্ডিনেশন কমিটিকে জানাতে হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ওই পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা কেন্দ্রের ভবনে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এমনকি প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতেও তার থাকার সুযোগ নেই। তবে অধ্যাপক মুনিরুল হক তার ছেলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানাননি বলে জানিয়েছেন ভর্তি পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে ‘সি’ ইউনিটের চিফ কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক গোলাম মর্তুজা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কোনো শিক্ষকের সন্তান বা নিকটাত্মীয় পরীক্ষার্থী হলে বিষয়টি লিখিতভাবে কো-অর্ডিনেশন কমিটিকে জানাতে হয়। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা কেন্দ্রের ভবনেও ওই শিক্ষক দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতেও তিনি থাকতে পারেন না।

অধ্যাপক মুনিরুল হক বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের কাছে এমন কোনো আবেদন দেননি।’

তবে ছেলের ব্যবহারিক পরীক্ষার সময় দায়িত্ব পালনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন অধ্যাপক মুনিরুল হক। তিনি বলেন, তার ছেলে পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়নি। এটি জানানো হলে ভালো হতো। তবে তিনি দাবি করেন, ব্যবহারিক পরীক্ষায় তিনি শুধু একজন পরিদর্শক ছিলেন। সেখানে তার নম্বর দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বীকার করে অধ্যাপক মুনিরুল হক বলেন, ‘নিয়ম একটু লঙ্ঘন হয়েছে। তবে খুব বেশি হয়নি। এতে সমস্যা হওয়ার কথা না।’

তবে এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমদ রাহী বলেন, ভর্তি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একজন শিক্ষকের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমরা পোষ্যকোটা বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু এটা তার থেকেও ভয়ংকর। এটা স্পষ্টত একটি প্রতারণা।’

অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য জানিয়েছিলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।