‘নির্ভীক জুলাই’— বেঁকে গেছে, তবু ভাঙেনি, ভাঁজে ভাঁজে যার প্রতিরোধের গল্প
একটি লৌকিক ধাতব কাঠামো। দূর থেকে দেখলে মনে হবে প্রচণ্ড আঘাতে বেঁকে গেছে বারবার। কোথাও কৌণিক ভাঁজ, কোথাও ক্ষতচিহ্নের মতো রুক্ষ পৃষ্ঠ। মাটির বুকে বৃত্তকার ভঙ্গিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো কাঠামোটি যেন একতার প্রতীক। যার তীক্ষ্ণ ঊর্ধ্বমুখী চূড়া আকাশ ছুঁতে চায়। এত ভাঁজ তবু ভেঙে পড়েনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্থাপনাটির নাম ‘নির্ভীক জুলাই’।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘দুর্মর’ কবিতার ‘জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়’ সেই বিখ্যাত পংক্তির মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনা যেন ক্ষতবিক্ষত, তবু যেন মাথা নোয়াতে নারাজ।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করেন ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম। এর আগে ৫ আগস্ট প্রায় ৫০ জন শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যের উপস্থিতিতে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-২০২৫-এর উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়। এর নকশা ও স্থাপত্য করেছেন স্থপতি নাজমুল। নামকরণ করেছেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য শাহীনুর রহমান। আর সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মো. ইকবাল হায়দার।
‘নির্ভীক জুলাই’ শুধু স্মৃতিস্তম্ভ নয়
‘নির্ভীক জুলাই’কে কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দেখলে এর নকশার অন্তর্নিহিত গল্পটি পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এর প্রতিটি রেখা, ভাঁজ, উপাদান ও পরিসরের পেছনে রয়েছে আলাদা অর্থ।
স্থাপত্য ভাবনায় বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনের সাহস, প্রতিরোধ ও নির্ভীক চেতনাকে স্থাপত্যের ভাষায় প্রকাশ করাই ছিল এই নকশার মূল লক্ষ্য। তাই এমন একটি রূপ বেছে নেওয়া হয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে আছে সংগ্রামের ক্ষত, প্রতিরোধের শক্তি এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রত্যয়। একটি দৃঢ় বৃত্তাকার ভিত্তি থেকে উঠে গেছে ভাঁজ করা রুক্ষ ধাতব কাঠামো। মাটির সঙ্গে তার সংযোগ যেন ইতিহাস ও শেকড়ের কথা বলে। আর সেই কাঠামোর আকাশমুখী যাত্রা যেন প্রতিকূলতা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে।
স্মৃতিস্তম্ভটির সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য এর ভাঁজ করা ধাতব কাঠামো। তীক্ষ্ণ ও কৌণিক ভাঁজে গড়া এই অবয়বকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেন একটি ধাতব পাত প্রচণ্ড আঘাতে বারবার বেঁকে গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েনি। এই দৃশ্যটিই যেন জুলাইয়ের মানুষের মানসিকতার সঙ্গে স্থাপনাটির সবচেয়ে সরাসরি সংযোগ তৈরি করে। আঘাত এসেছে, প্রতিকূলতা এসেছে কিন্তু অবস্থান থেকে সরে না যাওয়ার দৃঢ়তাই এখানে মুখ্য।
নির্মাণের ভাবনায় আরও বলা হয়েছে, এই ভাঁজ করা রূপ জুলাইয়ের সেই নির্ভীক মানুষদের প্রতীক, যারা আঘাত ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও তাঁদের অবস্থান থেকে সরে যাননি। ধাতব কাঠামোর খণ্ডিত সমতলগুলোতেও রয়েছে সংগ্রামের বিভিন্ন মুহূর্ত, সংঘাত, আত্মত্যাগ ও সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীকী ইঙ্গিত। এর ভাঁজগুলো ক্রমেই ওপরের দিকে উঠে গিয়ে তৈরি করেছে অদম্য সংকল্পের একটি দৃশ্যমান রেখা।
‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর উপাদান। এটি কর্টেন স্টিল দিয়ে নির্মিত। ধাতব কাঠামোর বাদামি-লালচে রুক্ষ আবরণটি এই উপাদানের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বলা হয়, সাধারণ স্মৃতিস্তম্ভে চকচকে, নিখুঁত ও দীর্ঘস্থায়ী সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও এখানে উল্টো পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। ধাতুর রুক্ষতাকেই রাখা হয়েছে দৃশ্যমান। কারণ সময়ের সঙ্গে কর্টেন স্টিলের পৃষ্ঠে আবহাওয়াজনিত পরিবর্তন ও ক্ষয়ের চিহ্ন তৈরি হয়। নকশার ভাবনায় এই পরিবর্তনকে সময়, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। ধাতুটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত পালিশ বা অলংকরণ করা হয়নি বরং এর কাঁচা ও দৃঢ় চরিত্রকে সামনে রাখা হয়েছে। যাতে সময় এখানে স্মৃতিস্তম্ভের শত্রু হিসেবে নয় বরং সময়ের সঙ্গে তৈরি হওয়া দাগও স্মৃতির অংশ হয়ে উঠবে।
স্থাপনাটির নিচের বৃত্তাকার ভিত্তিও নিছক কাঠামোগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য নয়। এর মধ্যে রয়েছে ঐক্য ও সম্মিলিত শক্তির প্রতীকী অর্থ রয়েছে বলেও স্থাপত্যভাবনায় জানানো হয়।
একটি বৃত্তের নির্দিষ্ট শুরু কিংবা শেষ নেই। তাই নকশার ভাবনায় এই বৃত্ত একটি অভিন্ন সংগ্রাম এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্মিলিত স্মৃতির প্রতীক। জুলাইয়ের স্মৃতিকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও প্রত্যয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরাই এর উদ্দেশ্য। বৃত্তের কেন্দ্র থেকে উঠে যাওয়া ধাতব কাঠামোটি তাই যেন সম্মিলিত শক্তির ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া একক প্রত্যয়ের প্রতীক।
‘নির্ভীক জুলাই’ দিনে নানা রূপে দেখা দেয়। সূর্যের অবস্থান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে এর ভাঁজ করা ধাতব পৃষ্ঠে আলো পড়লে এর বিন্যাসও বদলে যায়। ফলে সকাল, দুপুর কিংবা বিকেলে একই কাঠামোর রূপ ধরা পড়ে ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তিতে। এই আলো কখনো কোনো ভাঁজকে স্পষ্ট করে, কখনো অন্য কোনো অংশকে ছায়ার মধ্যে নিয়ে যায়। নকশার ভাবনায় এই পরিবর্তনশীল আলো-ছায়া সংগ্রামের অন্ধকার ও আশার আলোর মধ্যকার প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি করে। এছাড়াও রাত নামলে স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশের আলোকসজ্জা তৈরি করে একটি মৃদু আলোকবলয়। অন্ধকারের মধ্যে সেই আলো যেন স্মৃতি, আশা ও প্রত্যয়ের একটি আলোকবর্তিকা।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানের প্রতীক
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, ‘নির্ভীক জুলাই’ কেবল একটি মনুমেন্ট নয়, এটি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁদের অনড় অবস্থানের প্রতীক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এখান থেকেই শিক্ষার্থীরা ন্যায্য দাবি তুলবে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ হবে।
স্মৃতিস্তম্ভটির বৃত্তাকার কাঠামোকে তিনি ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের নির্ভীক থাকার অনুপ্রেরণা হিসেবেও তিনি এই স্থাপনাটিকে দেখতে চান।
সাদিক কায়েম আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই নতুন বাংলাদেশ এসেছে তাই তাঁদের স্মৃতি ও বার্তা শুধু ক্যাম্পাসে নয়, ছড়িয়ে দিতে হবে সর্বত্র। তাঁর প্রত্যাশা, এই স্মৃতিস্তম্ভে এসে প্রতিটি শিক্ষার্থী সাহস, দেশপ্রেম ও ন্যায়বিচারের প্রেরণা লাভ করবে।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন শহীদ জোনায়েদের পিতা। সেখানে দেশ, জাতি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের জন্য দোয়া করা হয়। উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতার পর থেকে সময়ে সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো বদলাবে, বদলাবে ছায়ার রেখা। বৃষ্টিতে ধাতুর রং আরও বদলাবে। কর্টেন স্টিলের গায়ে পড়বে নতুন দাগ। তবুও কাঠামোটির মূল অবয়ব থাকবে ক্ষতবিক্ষত অথচ ঊর্ধ্বমুখী।