তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রভোস্ট অপসারণের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি, ১৫ দিন পেরলেও কাটেনি ধোঁয়াশা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অভিযুক্ত প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুনকে অপসারণের দাবিতে ভুক্তভোগীর অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা।
আজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীমের অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে অবস্থান নেন তারা। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় অবস্থান কর্মসূচি শেষ করেন ভুক্তভোগী এবং আগামীকাল সকাল থেকে আবারও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
ভুক্তভোগী ইব্রাহীম অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার ১৫ দিন পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তদন্ত কমিটি এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানালেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না আসায় তিনি এ অবস্থান কর্মসূচিতে বসেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রভোস্টকে অপসারণ না করা পর্যন্ত অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে ডাকসু নেতারা দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন। তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও আবাসিক হলের পরিবেশ নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে সেটির নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি। তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশাসনের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ফেসবুক পোস্টে বলেন, জুলাইয়ের পর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী নির্যাতন মোটাদাগে বন্ধ হয়ে যায়। শাহবাগ থানায় হামলার মধ্য দিয়ে ছাত্রদল নির্যাতন ও হামলার কালচার ক্যাম্পাসে পুনরায় ফিরিয়ে আনে।
বর্তমান ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তীতে ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট ইলিয়াছ আল মামুন হলের শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করার মাধ্যমে নিজেই নির্যাতনের কালচারকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে ফেলে। আর প্রশাসন এই নির্যাতনের বৈধতা দেয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে ভিক্টিমকেই মাঠে নামতে হয়েছে বিচারের দাবীতে। নির্যাতক প্রভোস্টের অপসারনের দাবীতে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষনা দিয়েছে ভিক্টিম শিক্ষার্থী ইব্রাহিম, ফজলুল হক মুসলিম হলের নির্যাতিত জিএস ইমামসহ অন্যরা।
এর আগে, গত ১৬ আগস্ট ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীমকে প্রভোস্টের কক্ষে ডেকে নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রেখে মানসিক হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া এবং জোরপূর্বক লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ ওঠে অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুনের বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর বিষয়টি দ্রুত হলের অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা প্রভোস্টের পদত্যাগ এবং ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি জানান। একপর্যায়ে হলের প্রশাসনিক কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন তাঁরা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রভোস্টের কার্যালয় ঘিরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এতে হল সংসদের ভিপি-জিএসসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন বলে জানা যায়।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তের উদ্যোগ নেয়। ১৬ আগস্ট প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতনকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তের পাশাপাশি ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ নিয়েও শুরু হয় আলোচনা। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ফুটেজ সংরক্ষণ, উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে তা পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়।
এদিকে গত ২০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উপস্থিতিতে ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানায় ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদ।
অন্যদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুন। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থীকে মারধর বা নির্যাতন করা হয়নি।
ফলে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের উপর নির্ভর করতে হবে। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের গতি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।