ব্যাচের গ্রুপে সিনিয়র ছাত্রীকে নিয়ে ছাত্রদল নেতাসহ ৫ বন্ধুর কুরুচিপূর্ণ আলোচনা, প্রক্টর অফিসে অভিযোগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনিয়র এক নারী শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, সাইবার বুলিং ও যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে পাঁচ জুনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে রয়েছেন শাখা ছাত্রদলের সহ-ত্রাণ ও যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদকও। প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দেওয়ার পরও থামেনি হয়রানি। ভুক্তভোগীর ছবি ব্যবহার করে নতুন গ্রুপ খুলে ফের তাকে হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ভুক্তভোগী ২০২৩-২৪ সেশনের ছাত্র প্রতিনিধি (সিআর)। অভিযুক্তরা হলেন—২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মারুফ, লাবণ্য তিশা, তানভীর হোসেন, জোবাইদা বিনতে হোসেন এবং সোলায়মান আবির। এদের মধ্যে মারুফ চবি ছাত্রদলের সহ-ত্রাণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সম্পাদক। তবে তার দলীয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বলেন তিনি কোনো পদে নেই। তবে, তার ফেসবুক আইডিতে পদের বিষয়টি স্পষ্ট রয়েছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ২৯ আগস্ট ‘সিইউ ইনসাইডার’ নামক ফেসবুক পেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র-জুনিয়র শিষ্টাচার নিয়ে প্রকাশিত একটি ব্যঙ্গাত্মক (মিম) পোস্ট ২৩, ২৪ ও ২৫ শিক্ষাবর্ষের সমন্বিত এক ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে শেয়ার করেন অভিযুক্তদের একজন। পরে ওই শিক্ষার্থীদের পারিবারিক শিক্ষা ও আচার-ব্যবহার নিয়ে অশালীন মন্তব্য শুরু হয়।
গ্রুপে অপ্রয়োজনীয় তর্ক না করার অনুরোধ জানিয়ে বিষয়টিকে শান্ত করার চেষ্টা করেন ভুক্তভোগী ব্যাচ প্রতিনিধি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযুক্তরা নিজেদের ব্যাচের গ্রুপে ওই নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে যৌন হয়রানিমূলক কথাবার্তা বলেন।
প্রক্টর অফিসে অভিযোগের পরও থামেনি হয়রানি
ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিভাগীয় সভাপতির পরামর্শে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। প্রক্টর অফিস থেকে অভিযুক্তদের কারণ দর্শানোর জন্য ডেকে পাঠানো হলে নিজেদের ভুল স্বীকার না করে একটি নতুন ট্রোল গ্রুপ খুলে সেখানে ভুক্তভোগীর এক বন্ধুর আইডি থেকে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি কভার ফটো হিসেবে ব্যবহার করে হয়রানি করেন। পরে ওই গ্রুপের এক সদস্য অনুশোচনা থেকে ভুক্তভোগীকে স্ক্রিনশট পাঠালে মূল ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সিআর হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়া ওদের সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা ছিল না। একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আমাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাইবার বুলিং ও যৌন হয়রানি করা হয়েছে। প্রক্টর অফিসে জানানোর পরও তারা থামেনি। আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। কেননা আজকে এ ঘটনার বিচার না হলে কালকে আরেকজন মেয়ে এমন ঘটনার শিকার হবে। প্রশাসনকে বলব যথাযথ তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে মোস্তাফিজুর রহমান মারুফ বলেন, এই ঘটনার পর আমাদের যে পাঁচজনের নামে অভিযোগ করা হচ্ছে তাদের মধ্যে দুইজন মেয়েও আছে। তারাও তো এখন সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। আর ঘটনাটা মূলত র্যাগিং থেকে শুরু। তারা (সিনিয়র ব্যাচ) আমাদের মাঝেমধ্যে একসাথে করে বিভিন্নভাবে র্যাগিং করত। প্রথমে আমরা এটা সিনিয়রদের শাসন হিসেবে নিলেও পরে এটা অতিরিক্ত হয়ে যায়। তাই পরে এ বিষয় আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলি। তবে তেমন কোনো যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেনি। আর গ্রুপে তর্কের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু ছবি বিকৃতি বা নতুন গ্রুপ তৈরির সাথে আমি যুক্ত নই।
তিনি বলেন, আর ঘটনাটির পর আমরা সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আমাদের ওই দুই বান্ধবীও অনেক ভেঙে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না। এটা সামনে সমাধান হবে তখন আপনারা জানতে পারবেন।
এ বিষয়ে চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বী তৌহিদ বলেন, অভিযোগটি বর্তমানে প্রক্টর অফিসের মাধ্যমে বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বিভাগে সুরাহা না হলে পরবর্তী ধাপে বিষয়টি সমাধান করা হবে। সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সরাসরি সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে এবং ‘চাকসু ফ্রি লিগ্যাল এইড সেল’-এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে বিনামূল্যে নারী আইনজীবীর সহায়তা প্রদান করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, অভিযোগটি আমরা পেয়েছি। প্রক্টর অফিস বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। কোনো শিক্ষার্থীকে সাইবার হ্যারাসমেন্ট করার সুযোগ নেই। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।