ঝুমুর নাচে মুখর জাবি, শেষ হলো কারাম উৎসব
ঝুমুর নাচ, ঢোল-মাদলের তালে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) উদযাপিত হয়েছে উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব।
আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দিনব্যাপী কারাম উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গ আদিবাসী কারাম উৎসব আয়োজক কমিটি ও আরফির যৌথ আয়োজনে ২৭ আগস্ট শুরু হওয়া এ উৎসব কারাম গাছের ডাল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
উৎসবে ওরাও সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মাহালী ও মুড়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা অংশ নেন। রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে অংশগ্রহণকারীরা ঝুমুর নাচ, লোকগান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন। উৎসব ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
আয়োজকরা জানান, কারাম উৎসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কৃষিনির্ভর জীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। ভালো ফসল, মানুষের কল্যাণ এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে এ উৎসব পালন করা হয়। ওরাওদের পাশাপাশি মাহালী ও মুড়া সম্প্রদায়ের মানুষও কারাম উৎসব পালন করেন।
উত্তরবঙ্গ আদিবাসী কারাম উৎসব আয়োজক কমিটির কোষাধ্যক্ষ রবিকান্ত খালকো বলেন, আমরা প্রকৃতিকে পূজা করি, কারণ প্রকৃতি ভালো থাকলে মানুষও ভালো থাকবে। ভালো ফসলের জন্য, মানুষের সুন্দর জীবনের জন্য আমরা প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করি। কারাম উৎসব সেই কৃতজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ।
তিনি জানান, উৎসবের শুরুতে কারাম গাছের একটি ডাল এনে স্থাপন করা হয়। এরপর ধর্মীয় গুরু কারাম উৎসবের উৎপত্তি, ইতিহাস ও তাৎপর্য তুলে ধরেন। ধর্মীয় আচার শেষে শুরু হয় ঝুমুর নাচ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সারারাত চলে নাচ-গান ও মিলনমেলা। পরদিন নির্ধারিত সময়ে কারাম গাছের ডাল পানিতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন।
উৎসবের আয়োজন করা হয় নিজেদের অর্থায়নে। আয়োজক কমিটির ২০ জন সদস্য ব্যক্তিগতভাবে অর্থ সংগ্রহ করে প্রায় ৪০০ মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেন।
রবিকান্ত খালকো বলেন, সরকারি সহযোগিতা পেলে এই উৎসব আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইন্ডিজেনাস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএসএ) সাংস্কৃতিক সম্পাদক সোমা ডোমরি বলেন, ২০২০ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমরা বিভিন্ন আদিবাসী উৎসব, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু একটি উৎসব আয়োজন নয়। আমরা আমাদের দর্শন, সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান ও জীবনবোধ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। একই সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, অধিকার ও সংগ্রামের কথাও তুলে ধরতে চাই।
জাবিতে কারাম উৎসব আয়োজনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সোমা ডোমরি বলেন, আমরা যেমন বাঙালি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উৎসবে অংশ নিই, তেমনি চাই আমাদের উৎসবেও সবাই অংশগ্রহণ করুক। একে অপরের সংস্কৃতিকে জানুক, বুঝুক এবং সম্মান করুক। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়েই বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য টিকে থাকে।
তিনি আরও বলেন, আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্র চাই, যেখানে সব জাতিগোষ্ঠী সমান মর্যাদায় নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার চর্চা করতে পারবে। কারাম উৎসব সেই সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তাই বহন করে।
তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ নিয়ে শঙ্কার কথাও জানান আয়োজকরা। তাদের দাবি, ওরাও সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা সাদ্রী ও কুড়ুখ ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মাতৃভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে না। তাই ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার কার্যকর বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।
দুই দিনের উৎসব শেষ হয়েছে কারাম গাছের ডাল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। আয়োজকদের মতে, কারাম উৎসব শুধু একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন নয়; বরং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।