‘বুলিং একটি সুস্থ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের জন্য বড় বাধা’
‘বুলিং একটি সুস্থ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের জন্য বড় বাধা। এটি একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।’ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২৭তম ব্যাচের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘জাগরণ: বুলিংবিরোধী ক্যাম্পেইন ২০২৬’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুলিং প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং একটি নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ও ইতিবাচক ক্যাম্পাস পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী এ কর্মসূচির স্লোগান ছিল ‘শক্তি দেখাও, সহানুভূতিতে’। এতে বুলিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা, পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি এবং ক্যাম্পাসে ইতিবাচক সম্পর্ক ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আয়োজকরা জানান, ‘জাগরণ’ নামটি বেছে নেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বের জাগরণ তৈরি করা। কেউ বুলিংয়ের শিকার হলে তা প্রত্যক্ষকারী শিক্ষার্থীরা কীভাবে দায়িত্বশীল ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে এবং বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কীভাবে দাঁড়াতে পারে, এ বিষয়েও সচেতনতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে ক্যাম্পেইনটির।
ক্যাম্পেইনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং মার্কেটিং বিভাগের ২৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবিদা আঞ্জুম বলেন, ক্যাম্পেইনের নাম ‘জাগরণ’ রাখার মূল কারণ হলো আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের জাগরণ তৈরি করা। আমাদের সামনে যখন কাউকে বুলিংয়ের শিকার হতে দেখি, তখন আমরা কী করলে সে বুলিংয়ের শিকার হবে না, সেই বুদ্ধিমত্তার জাগরণ ঘটানোই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন শুধু মুখে কিছু বলা বা মন্তব্য করাই বুলিং। কিন্তু বুলিংয়ের বিভিন্ন দিক রয়েছে। এটি মৌখিক, শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, শিক্ষাগত কিংবা সাইবার, বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। অনেকেই এসব বিষয় সম্পর্কে জানেন না। তাই বুলিংয়ের বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড কীভাবে বন্ধ করা যায়, তার কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেওয়াই আমাদের ক্যাম্পেইনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আবিদা আঞ্জুম আরও বলেন, আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কেবল কথা বলবে না, বরং কৌশলগতভাবে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে যেন কেউ বুলিংয়ের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সিরাজুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড লিগ্যাল স্টাডিজের পরিচালক ও আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা এবং ক্লিনিক্যাল ও কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানী মো. আসাদুজ্জামান রাজু আকন।
এছাড়া আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির করপোরেট ডিভিশনের ইউনিট হেড মো. মাহবুবুর রহমান এবং সাজেদা ফাউন্ডেশনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘স্বজন’-এর হেড অব ডিজিটাল হেলথ মো. মনোয়ার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
দিনব্যাপী আয়োজনে বুলিং প্রতিরোধ, শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা নিয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীরা যাতে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, সম্পর্কজনিত সমস্যা ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সহায়তা পেতে পারে, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. সিরাজুল হক বলেন, ‘বুলিং একটি সুস্থ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের জন্য বড় বাধা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়; এখানে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধও গড়ে উঠতে হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুলিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং এ ধরনের আচরণ প্রতিরোধে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা বলেন, ‘বুলিং প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। ক্যাম্পাসে কেউ যেন ভয়, অপমান বা হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’
ক্লিনিক্যাল ও কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানী মো. আসাদুজ্জামান রাজু আকন বলেন, ‘বুলিং একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বুলিংয়ের ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের সচেতন করা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী বুলিং বা মানসিক চাপে থাকলে তাকে দোষারোপ না করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।’
আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির করপোরেট ডিভিশনের ইউনিট হেড মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ ও ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা সমাজের সবার দায়িত্ব। বুলিংবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে ‘জাগরণ’ যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
আরও খবর: পদত্যাগ করছেন পিএসসি চেয়ারম্যান
সাজেদা ফাউন্ডেশনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘স্বজন’-এর হেড অব ডিজিটাল হেলথ মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, বুলিং শুধু একটি আচরণগত সমস্যা নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতা ও আত্মবিশ্বাসের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের সময় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও যথাযথ সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
আয়োজক আবিদা আঞ্জুম জানান, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানো এবং নিজেদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখার বিষয়টিকেও ক্যাম্পেইনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা কীভাবে বিভিন্ন চাপ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে এবং প্রয়োজনে কীভাবে সহায়তা নিতে পারে, সে বিষয়েও সচেতন করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ক্যাম্পেইনটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন সহযোগিতা করেছে। এর মধ্যে শিরোনাম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি, সহযোগী পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সাজেদা ফাউন্ডেশনের ‘স্বজন’, ক্লাব পার্টনার হিসেবে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যারিয়ার ক্লাব (ডিইউসিসি), স্ন্যাকস পার্টনার হিসেবে প্রাণ এবং টেকনিক্যাল পার্টনার হিসেবে মনের বন্ধু সহযোগিতা করেছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বুলিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানোই ‘জাগরণ’ ক্যাম্পেইনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ক্যাম্পাসে একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলেও জানান তারা।