০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৯:০৬

আমেরিকায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নেতাকে ৪ মাসের ছুটি দিল প্রশাসন

অধ্যাপক ড. মো. জোবায়ের আলম  © টিডিসি সম্পাদিত

২০২৩ সালে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথমবার পিতৃত্বকালীন ছুটি চালু হয়েছিল সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিয়ম অনুযায়ী, একজন শিক্ষক ১৫ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। এরপর অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ছুটির নজির নেই। তবে মাতৃত্বকালীন ছুটি রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ফলে মাতৃত্বকালীন ছুটি গ্রহণের তারিখ গর্ভবতী হওয়ার পর যে তারিখ হতে ছুটিতে যাওয়ার আবেদনের তারিখ হতে ৬ মাসের ছুটি পেয়ে থাকেন কর্মজীবী নারীরা।

কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ঘটল ‘অসাধারণ’ এক ছুটির ঘটনা। বিশেষ বিবেচনায় আওয়ামীপন্থী এক শিক্ষক নেতাকে ‘মানবিক কারণ’ দেখিয়ে ৪ মাস ৯ দিনে ‘অসাধারণ’ ছুটি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট। গত ২৮ জুলাই সিন্ডিকেট সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের নিয়মিত এক সভায় এই ছুটির অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই ছুটির অনুমোদনের কথা জানানো হয়।

ওই শিক্ষকের নাম ড. মো. জোবায়ের আলম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী নীল দলের শিক্ষক নেতা হিসেবে পরিচিত এই অধ্যাপক বর্তমানে সস্ত্রীক আমেরিকায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকে গত ৬ জুন এই ছুটি চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে চিঠি পাঠান ড. মো. জোবায়ের আলম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্যাসিস্ট শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ড. মো. জোবায়ের আলমকে এমন ছুটি দেওয়া নজিরবিহীন। এটা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খারাপ নজির হিসেবে থাকবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট চাইলে মানবিক দিক বিবেচনা করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে জানা গেছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে নীলফামারী-৩ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ড.  জোবায়ের

জানা গেছে, গত ৬ জুন ভবিষ্যৎ অর্জিত ছুটি/বিনা বেতনে ছুটির আবেদন চেয়ে বিভাগটির চেয়ারম্যানের মাধ্যম হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর এক চিঠিতে লেখেন ড. মো. জোবায়ের আলম। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ৯ বছরের অপেক্ষার পর আমার স্ত্রী আমাদের প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় রয়েছি। তিনি বর্তমানে ৮ মাসের গর্ভবতী এবং তাঁর সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য সময় আগামী ১৬ আগস্ট। এই পরিস্থিতিতে, তাঁর পক্ষে দেশে ফিরে আসা সম্ভব নয় এবং এই সংকটময় সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং যত্ন প্রদানের জন্য তাঁর পাশে আমার উপস্থিতি অপরিহার্য। এই পরিস্থিতি বিবেচনায়, ২৩ জুন থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বিনা বেতনে ছুটির জন্য আবেদন করছি।

পরে তাঁর ছুটি মঞ্জুর করে এক চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ৬ জুনের চিঠির বরাতে এবং ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মানবিক কারণে ও বিশেষ বিবেচনায় ২৩ জুন থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৪ মাস ৯ দিন বিনাবেতনে অসাধারণ ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে। ছুটি শেষে ৮ সপ্তাহের মধ্যে বিভাগের কাজে যোগদান করার জন্য অনুরোধ করা হলো। এই সময়ের মধ্যে কাজে যোগদানে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সূত্র জানা যায়, ড. মো. জোবায়ের আলমের এমন চিঠি বিভাগে যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে খোঁজ নেওয়া হয় এরকম ছুটির নিয়ম আছে কিনা। তবে বিভাগকে জানানো হয়, এরকম কোনো ছুটি দেওয়ার নিয়ম নেই। পরে বিভাগের সিএন্ডডি কমিটির সভায় এ ধরনের ছুটি না দেওয়ার পক্ষে সবাই একমত। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লিখিতভাবেও জানানো হয়েছে বিষয়টি। তবে সম্প্রতি সিন্ডিকেটের সভায় বিষয়টি অনুমোদন হওয়ার পর হতবাক সবাই।  

এ বিষয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. আবু হেনা মোহাম্মদ ইউসুফ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি চেয়ারম্যান হিসেবে একটি চিঠি পেয়েছিলাম। তবে এই ছুটি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এজন্য আমি কিছু জানি না।

বিষয়টি জানতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামকে মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ড. জোবায়েরে মাধ্যমে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে খণ্ডকালীন ক্লাস নিতেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নিজের অসুস্থতা কিংবা পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে মানবিক কারণে বিশেষ বিবেচনায় এরকম ছুটি দেওয়া হয়। তবে অধ্যাপক ড. মো. জোবায়ের আলমের বিষয়টি চিঠি না দেখে বলতে পারব না।

বিষয়টি জানতে অধ্যাপক ড. মো. জোবায়ের আলমের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কে এই আওয়ামী শিক্ষক নেতা?
ড. মো. জোবায়ের আলম ছাত্রজীবনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় এসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-৩ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসাবে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে অবশ্যই মনোনয়ন পাননি।

এছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের নীল দলের যুগ্ম আহ্বায়ক, আওয়ামী লীগের নীলফামারী জেলা শাখার কার্যনির্বাহী সদস্য এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্যও ছিলেন।

ছাত্র থাকা অবস্থায় ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক মুসলিম হল নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর ঢাবির নীল দলের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এছাড়াও মাদারীপুর-৩ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন জামাতাও ছিলেন ড. মো. জোবায়ের আলম। তবে তাঁর মেয়ের সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছে বলে জানা গেছে।