০৪ আগস্ট ২০২৬, ২১:২২

ঢাবির গণিত বিভাগে ‘রক্তাক্ত জুলাই: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভা

ঢাবির গণিত বিভাগে ‘রক্তাক্ত জুলাই: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভা  © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণিত বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘রক্তাক্ত জুলাই: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভা। সোমবার (৩ আগস্ট) এ এফ মুজিবুর রহমান গণিত ভবনের রেজাউর রহমান অডিটোরিয়াম এটি অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম। 

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোফাজ্জল হোসেন, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম, বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রী শহীদুল আলম এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম ভুঁইয়া। 

অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক শাপলা শিরিন। অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ছিলেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসমা আক্তার আখি এবং গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী তানহা খন্দকার।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র আল-কুরআন থেকে পাঠ করেন ফাতেহ আজম মাহমুদ, পবিত্র গীতা থেকে পাঠ করেন রুদ্র চক্রবর্তী এবং পবিত্র ত্রিপিটক থেকে পাঠ করেন প্রিয়ন্তী বড়ুয়া পর্ণা। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ শেষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। শহীদ পরিবার এবং আহতদের সুস্থতা কামনা করে মোনাজাত করেন ফাতেহ আজম মাহমুদ। সাদমান শাহরিয়ার মাহিন সম্পাদিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের ঘটনাবলি সম্বলিত একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। ডকুমেন্টারিতে জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয় এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের স্থিরচিত্র, ভিডিও চিত্র উপস্থাপিত হয়।

অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্যায়ে স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন অনুষ্ঠানটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাগত বক্তব্যে প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিবৃন্দ, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদেরকে স্বাগত জানান। বক্তব্যে তিনি বলেন. বর্তমানে সুশীল শ্রেণী এবং সর্বোচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব লক্ষণীয়। সুখী মানুষের জামার গল্পের মত এখন দেশপ্রেমিক মানুষ খুজতে হয়, এমন একটি অবস্থায় পৌছেছে বাংলাদেশ। বক্তব্যের এক পর্যায়ে দেশীয় একটি জনপ্রিয় পত্রিকার একটি সংবাদের শিরোনাম "তথাকথিত বন্দিশালা" উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন যে আমরা শহীদদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে এখনও আয়না ঘরকে কীভাবে অস্বীকার করতে পারি? 

তিনি আরও বলেন, যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুরু থেকেই আওয়াজ তুলতেন, এবং ছাত্রদের যৌক্তিক দাবির পক্ষে থাকতেন, তাহলে জাতিকে হয়তো একটি গণহত্যা দেখতে হতো না। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানান এবং জাতীয় পাঠ্যপুস্তক লিখনে যোগ্যদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্মৃতিচারণমূলক এবং জুলাইয়ের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি নিয়ে বক্তব্য রাখেন আফিয়া আরাফ খেয়া, রাজু চৌধুরী, আতিকা বিনতে আনোয়ার ও মো. আলমগীর। গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মো: দেলোয়ার হোসেন যিনি জুলাইয়ে কাফনের কাপড় পড়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং আন্দোলনে আহত হয়েছিলেন, তার বক্তব্যে জুলাইয়ের কিছু আবেগঘন মুহূর্ত নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন এবং শহীদদের খুনিদের বিচারের দাবি করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব এবং আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ, গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ সালেহীন অয়ন তার বক্তব্যে স্মরণ করেন মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে স্বাধীনতার নিউক্লিয়াসের ব্যক্তিত্ব সিরাজুল আলম খান কে, যিনি গণিত বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। এরপর তিনি সিরাজুল আলম খান এর লেখা ‘‘বাঙালির তৃতীয় জাগরণ’’ বইটি থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় জাগরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ব্যক্ত করেন এবং বাঙালির তৃতীয় জাগরণ ২০২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে এই কথাটি ব্যক্ত করেন। গণিত বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এই কিংবদন্তিকে স্মরণে রাখার জন্য উনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে স্মরণসভা আয়োজনের দাবি জানান।

গণিত বিভাগের প্রভাষক শোভা ইসলাম যিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন গণিত বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন, তার বক্তব্যে তিনি বলেন যে জুলাই এর একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন। তিনি দাবি করেন যে এই মেধার মূল্যায়ন যেন সরকারি চাকরি হয়ে যাওয়ার পরও অবিরত থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা বিদেশে পিএইচডি করতে গিয়ে আর দেশে ফিরে আসেন না কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ-সুবিধা, পরিবেশ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশকে উন্নত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং জুলাই পরবর্তী ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো যেন অব্যাহত থাকে এই কামনা করে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।

অনুষ্ঠানের বিশেষ বক্তা শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা বক্তব্যে বলেন, ফারহানের কখনও সরকারি চাকরি করার ইচ্ছা ছিল না। ফারহান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল মেধার মূল্যায়নের জন্য। যখন শিক্ষার্থীদের উপর গুলি চললো, ফারহানকে বাসায় রাখতে পারেনি তার বাবা। জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করে এবং একমাত্র সন্তান হারানোর দুঃখ প্রকাশ করে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদদের খুনিদের বিচার দাবি করেন।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রী শহীদুল আলম তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদেরকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিবাদ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। বিগত ফ্যাসিবাদের দায় আমাদের সবার, কারণ আমরা নীরব ছিলাম। নীরবতা ফ্যাসিস্টের ভাষা। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন যে শিক্ষার্থীরা যে পরিবর্তন করতে পেরেছেন এবং যে পরিবর্তন আনতে চান, এজন্য তাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ১০৭ দিন কারাবরণের স্মৃতিচারণ করেন। রাষ্ট্রের মেরামত হয়নি, এবং এই মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম থামবে না বলে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি, বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোফাজ্জল হোসেন তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ সবসময়ই পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী গণ-অভ্যুত্থান, ২৪ এর ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা এই জাতির ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে বলে উনি ব্যক্ত করেন। জুলাইয়ের প্রাপ্তি হিসেবে তিনি বলেন যে ফ্যাসিবাদের সময়কালে আমরা কেউই মন খুলে কথা বলতে পারতাম না, কিন্তু ২৪ এর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই নীরবতা ভেঙেছে, এখন সবাই মন খুলে কথা বলতে পারে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: শহীদুল ইসলাম তার বক্তব্যে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ভয়াবহ কার্যক্রম তুলে ধরেন। আয়না ঘরের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কবরেও মানুষ আয়না ঘরের চেয়ে বেশি শান্তিতে থাকে। যে জুলাই শহীদ ও আহতদের বিনিময়ে আমরা নতুন করে বাংলাদেশ পেয়েছি, তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো যেন বাস্তবায়িত হয় এই আশাবাদ তিনি ব্যক্ত করেন।

গণিত বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত ‘আমার চোখে জুলাই’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখন প্রতিযোগিতায় ৫টি বাছাইকৃত প্রবন্ধকে পুরস্কৃত করা হয়। মো. ফারাবি রহমান শ্রাবণ, আফিয়া আরাফ খেয়া, জান্নাতুল নাঈমা, মাহমুদুল হাসান, ইসরাত জাহান শর্মী পুরস্কার গ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি ও গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাপলা শিরিন। তিনি জুলাইয়ে শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং শহীদদের খুনিদের বিচারের দাবি করে তিনি অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।