ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে শিবির-ছাত্রদলের হাতাহাতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষের রুমে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হাতাহাতিতে জড়িয়েছেন। হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে দুজন বহিরাগতের বিরুদ্ধে ‘সমকামী কর্মকাণ্ডে’ জড়ানোর অভিযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ হাতাহাতির সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে। আজ রবিবার (২ আগস্ট) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। উভয় ছাত্র সংগঠন এক অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনেছে।
জানা গেছে, গতকাল শনিবার (১ আগস্ট) হলের অভ্যন্তরে সমকামিতার অভিযোগে ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির বৈঠককে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তদন্ত কমিটির সভা চলাকালে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে এবং হল ভবনের বাইরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির পর হাতাহাতি হয়। ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
‘ছাত্রদলই হামলা’ করেছে দাবি করে শিবির সমর্থিত শহীদুল্লাহ হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তৌকির হাসান বলেন, দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে হলের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির ডাকে তদন্তে অংশ নিতে যাই। ওই তদন্তে হল সংসদের এজিএস এবং তার রুমমেটকে ডাকা হয়েছিল। তদন্ত শুরু হওয়ার পরপরই ছাত্রদলের দুইজন সদস্য তদন্ত কমিটির বৈঠক চলাকালে রুমে প্রবেশ করেন। পরে ঘটনার বিষয়টি দেখার জন্য আমি প্রভোস্ট অফিসে যাই। সেখানে হাউজ টিউটররা সবাইকে রুম থেকে চলে যেতে বলেন।
“এরপর ছাত্রদলের সদস্যরা প্রভোস্ট অফিসের সামনে অবস্থান নেয় এবং আমরা প্রভোস্ট অফিসের দ্বিতীয় তলায় অবস্থান করি। তারা (ছাত্রদল) অভিযোগ তোলে যে ছাত্রশিবিরের একজন সদস্য তাদের ছবি তুলেছেন। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে তারা ওই ব্যক্তির ওপর হামলা চালায়। এরপর আমরা সবাই প্রভোস্টের কক্ষে আশ্রয় নিই। সেখানে কী ঘটছে, সেটি ধারণ করার জন্য আবার ভিডিও করা হয়।“
সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করেও ছাত্রদল পুনরায় হামলা শুরু করে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ওই সময় ঘটনাস্থলে পাঁচজন হাউস টিউটর উপস্থিত থাকলেও, তাদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোছাদ্দিক হক বলেন, গতকালকের ঘটনায় ছাত্রশিবির এজিএস ইব্রাহীম খলিলকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। সমকামিতাকে প্রমোট করতে গিয়ে শিবির বিভিন্নভাবে তাকে (এজিএসকে) ডিফেন্ড করার চেষ্টা করছে এবং এজন্য নানা ধরনের মিথ্যাচার শুরু করেছে।
“গতকাল তারা সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করে দিয়েছে, যাতে কোনোভাবেই প্রমাণ করা না যায় যে ওই সময় সে সেখানে উপস্থিত ছিল। এভাবে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যাচারের মাধ্যমে তারা তাদের পক্ষ নেওয়ার চেষ্টা করেছে।”
হাতাহাতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজকে দুপুরে প্রভোস্ট ইব্রাহীমকে ডাকলে একপর্যায়ে প্রভোস্ট অফিসে তারা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। আমরাও প্রভোস্ট অফিসে অবস্থান নেই। পরে তারা আমাদের ওপর হামলা চালায়। সে সময় আমরা বাইরে ছিলাম। পরবর্তীতে যখন ভেতরে ঢুকি, তখন তারা আবার আমাদের ওপর হামলা করে। এতে আমাদের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম ভূইয়া তাৎক্ষণিক পদত্যাগ করেছেন বলে দুইপক্ষই দাবি করেছে। তবে এ বিষয়ে প্রাধ্যক্ষকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে বলে হল প্রভোস্ট জানালে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রক্টরসহ একটি মোবাইল টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। আমরা তো পুলিশ নই, তারপরও দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করে পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ঘটনাটির তদন্ত কার্যক্রম চলছে বলে আমার জানা আছে।
ক্যাম্পাসে শিবিরের বিক্ষোভ
শহীদুল্লাহ হলের ঘটনায় জড়িতদের বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মধুর ক্যান্টিন থেকে ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে প্রতিবাদ মিছিলটি বের হয়। পরে সমাবেশে নেতারা বক্তব্য দেন।
বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি মহিউদ্দিন খান অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অতীতে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে নিজ দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর নজির থাকলেও বর্তমান প্রশাসন তা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, এর আগেও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় হামলা, শহীদুল্লাহ হলসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার বিচার চেয়ে তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে এলেও প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। তার দাবি, সারা দেশেই সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির নানা ঘটনায় ছাত্রদল ও বিএনপির নাম উঠে আসছে।
মহিউদ্দিন খান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হামলা-সহিংসতা অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীরা আবারও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হবে, যেমনটি জুলাই আন্দোলনে হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল নতুন করে গেস্টরুম ও ‘টর্চার সেল’ সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং শিক্ষার্থীদের এসব অপসংস্কৃতি প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রদল যদি মনে করে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সহিংসতা চালিয়েও পার পেয়ে যাবে, তবে সেটি ভুল ধারণা। একসময় ছাত্রলীগ যেভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, প্রয়োজন হলে ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করায় বারবার শোকজ করা হচ্ছে, অথচ প্রকাশ্যে হামলা ও সন্ত্রাসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রক্টর অফিস থেকে ‘রাগের মাথায় সবাই ভুল করতে পারে’ এবং ‘রাগের মাথায় হামলা’–সংক্রান্ত মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে মহিউদ্দিন খান বলেন, এ ধরনের বক্তব্য সহিংসতাকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়া যায় না। তিনি ওই বক্তব্য প্রত্যাহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশাসনের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।
ঢাবি শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হুসাইন বলেন, তারা আগেও দেখেছেন ছাত্রদল শাহবাগ থানায় মব সৃষ্টি করে হামলা করেছে। বাংলাদেশের কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা চাঁদাবাজি হলে সেখানে ছাত্রদলের নাম না থাকা এখন বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদল প্রভোস্টের কক্ষে ঢুকে হামলা চালিয়েছে। প্রভোস্টের উচিত ছিল হামলার বিচার করা, কিন্তু তিনি ছাত্রদলের লোক হওয়ায় কিছু বলতে পারেননি এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন। একই কারণে প্রক্টর ও উপাচার্যেরও পদত্যাগ করা উচিত বলে দাবি করেন তিনি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের নেতারাই সাংবাদিকদের সামনে শাহবাগ থানায় হামলা চালিয়েছিল, কিন্তু প্রশাসন তাদের বিচার নিশ্চিত করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রদলের লেজুড়বৃত্তি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।