০২ আগস্ট ২০২৬, ১৭:২৬

চার বছরে ২ কোটি ১ লাখ টাকা পেয়েছেন সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়  © সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক চাপ কমাতে চালু হওয়া স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প চার বছরে উল্লেখযোগ্য সাড়া ফেলেছে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৬০৩ শিক্ষার্থী মোট ২ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৮৫১ টাকা পেয়েছেন। বর্তমানে আরও ২২৫টি দাবির আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যার অর্থের পরিমাণ ৮ লাখ ৫২ হাজার ৭৪৬ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, স্বল্প প্রিমিয়ামে চালু হওয়া এই বীমা প্রকল্প অসুস্থ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে।

গত ২৬ এপ্রিল ‘ক্লেইম রিপোর্ট অন রাজশাহী ইউনিভার্সিটি’ শিরোনামে জেনিথ লাইফ ইন্সুইরেন্স কোম্পানি লিমিটেড থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা যায়৷ সেখানে ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ক্লেইমের তথ্য প্রকাশ করেছে।

বীমা কোম্পানি চার বছরের রির্পোট থেকে  জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তারা টাকা পেয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৫ টাকা। চার বছরে ৩ হাজার ৬০৩ জন শিক্ষার্থীকে এ সুবিধা প্রদান করেছেন তারা। যার অর্থের পরিমাণ ২ কোটি ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৮৫১ টাকা। এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ২২৫  শিক্ষার্থীর ফাইল। যার অর্থের পরিমাণ ৮ লাখ ৫২ হাজার ৭৪৬ টাকা। মৃত ১০ শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়েছে ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বীমার শর্তবহির্ভূত হওয়ায় আবেদনের ফাইল প্রক্রিয়াধীন আছে ৪৯ জনের যার অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা বলে জানা গেছে। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের জুলাই মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দুই বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য বীমার চুক্তি প্রক্রিয়া শুরু করে জেনিথ লাইফ ইন্সুইরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। বার্ষিক ২৫০ টাকা প্রিমিয়ামে একজন শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে (৩ মাসে ৪ বার) ৮০ হাজার টাকা ও বহির্বিভাগে (এক দিনের হলেও প্রযোজ্য) ২০ হাজার টাকা পাবেন। এ ছাড়া প্রতিমাসে একাধিকবার কনসালটেন্সি ফি, মেডিকেল ফি, প্যাথলজি ফি ইত্যাদি বাবদও এ অর্থ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বীমা চলাকালে মৃত্যু হলে সেই শিক্ষার্থী ২ লাখ টাকা পাবেন। ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন করে আবারও বীমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বীমাসংক্রান্ত পরামর্শ এবং বিষয়গুলো তদারকির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সেল নেই। তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টার তত্ত্বাবধানে এই বীমাসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ বীমা অনলাইন সিস্টেম হওয়ায় একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ru.ac.bd প্রবেশ করলেই নিচে student insurance দেখাবে সেখানে ক্লিক করলে শিক্ষার্থীর আইডি নং ও রেজিস্ট্রেশন নং দিলেই তার প্রোফাইল চলে আসবে। সেখানে ফর্ম পূরণ করে সাবমিট করলে ফর্ম পেয়ে যাবে বীমা কোম্পানি। যদি ফর্মে ভুল তথ্য না থাকে তাহলে নিদিষ্ট সময়ে ওই শিক্ষার্থীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বীমার টাকা চলে আসে। তবে বীমা শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো শিক্ষার্থী রোগে আক্রান্ত হলে তারাই শুধু এ বীমার সুবিধা পেয়ে থাকবেন। 

কিডনিতে পাথর হওয়ার ফলে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রায় ৭৫ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন আরবি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আবু হাসনাত আবদুল্লাহ। পরে কাগজপত্র দেখিয়ে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আবেদন করলে ৭০ হাজার ৫শ টাকার মতো সুবিধা পান তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য ৭০ হাজার টাকা অনেক বড় ধরনের সুবিধা। আমি অনেক উপকৃত হয়েছি এ সুবিধা পেয়ে। তবে আমার এ সুবিধা পেতে প্রায় সময় লেগেছিল তিন মাস। এক পর্যায় ভেবেছিলাম টাকাটা আর পাব না। কিন্ত আলহামদুলিল্লাহ পেয়েছি। স্বাস্থ্য বীমা সম্পর্কে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিদিষ্ট কোনো কার্যালয় নেই। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় আমাদের। এ বিষয়ে প্রশাসন নজর দিবে বলে আমি আশাবাদী। ’

স্বাস্থ্য বীমা থেকে ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা সুবিধা পেয়েছে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব আল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমি একটি জটিল রোগের কারণে প্রায় ৪ মাস অসুস্থ ছিলাম। আমার সুস্থ্য হতে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা খরচ করতে হয়েছে। স্বাস্থ্য বীমা থেকে আমি সুবিধা পেয়ে অনেক উপকৃত হয়েছি। তবে টাকা পেতে আমার অনেক বেগ পেতে হয়েছে। স্বাস্থ্য বীমায় যে জটিলতা রয়েছে তা কিছুটা কমিয়ে আনা উচিত বলে মনে করি।’

বর্তমানে স্বাস্থ্য বীমার দেখভাল করছেন 
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এএইচএম খুরশিদ আলম। তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক চাপ কমাতে ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে স্বাস্থ্য ও জীবন বীমা প্রকল্প চালু রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ভর্তি ফির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বছরে ২৫০ টাকা প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে হয়। এর বিপরীতে বীমাকৃত শিক্ষার্থীরা মৃত্যুজনিত দাবির ক্ষেত্রে ২ লাখ টাকা, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে বছরে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকা এবং বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য বছরে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসাসংক্রান্ত সুবিধা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা Student Insurance পোর্টালে নিজস্ব শিক্ষার্থী আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অনলাইনে জমা দিতে হয়। এজন্য আবেদনকারীর নিজ নামে রকেট বা ব্যাংক হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক। নিয়মিত ছাত্রত্ব বহাল থাকা পর্যন্ত এ বীমা সুবিধা কার্যকর থাকে এবং শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে চিকিৎসা ব্যয়ের দাবি দাখিল করলে প্রাপ্য অর্থ তাদের হিসাবে প্রদান করা হয়।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেনিথ লাইফ ইন্সুইরেন্স কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ডেপুটি ভাইস প্রেসিডেন্ট) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত চার বছরে আমরা ২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি বিভিন্ন সময়ে। তবে এখনো অনেক দাবি (ক্লেইম) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় তিন কোটি টাকার মতো খরচ হয়েছে আমাদের। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রিমিয়াম পেয়েছি ২ কোটি ৭০ লাখ ৯৫ হাজার টাকার মতো। বর্তমানে প্রায় ৪৮ লাখ টাকার মতো আমরা লসে আছি। এ বছর এই বীমার মেয়াদ শেষ হওয়ায় আবার নতুন করে চুক্তি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় আমরা আন্তরিক আছি।’

সব শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আসার আহ্বান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা শারীরিকভাবে সুস্থ্য থেকে ক্যাম্পাসে নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করবে এটাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যাশা। তবে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের অনেকে অসুস্থ্য হতে পারে। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী হঠাৎ করে অসুস্থ হলে তাদের চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করা পরিবারের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। 

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য বীমা চালু হওয়ায় পর থেকে এসব শিক্ষার্থী এ সুবিধার আওতায় এসে অনেক উপকৃত হয়েছে। এবছর বীমার মেয়াদ শেষে আমরা আবার রিনিউ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষার্থী জটিল রোগে আক্রান্ত তাদেরকে দ্রুত এ সুবিধার আওতায় আসার আহ্বান জানাচ্ছি।’