জুলাইকে ব্যঙ্গ করে এবার চবি অধ্যাপকের পোস্ট
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহির আপত্তিকর মন্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার জুলাই নিয়ে আপত্তিকর ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আওয়ামীপন্থি অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর। এ ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু)।
গত ৩ জুলাই (শুক্রবার) নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ পোস্ট করেন চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আওয়ামীপন্থী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। তবে এ ঘটনার স্কিনসট গতকাল শনিবার (১১ জুলাই) ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
পোস্টে দেখা যায় তিনি জুলাই নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তিনি লেখেন, ‘জুলাই FDC হতে পারে, জুলাই FDR হতে পারে, জুলাই DPS হতে পারে, জুলাই SWISS হতে পারে, জুলাই 7.62 হতে পারে, মবুলাই হতে পারে। জুলাই সিজার হতে পারে। কিন্তু জুলাই CDI কেনো হবে ভাই? Honda CDI একটা ভালো মোটরসাইকেল। সবাইকে আমার জন্ম মাসের শুভেচ্ছা। জুলাই..... আস্তাগফিরুল্লাহ (হাই আসছেতো তাই বললাম)।’
তার ওই পোস্টের মন্তব্যে ফয়জুল করিম রিমন নামে একজন লেখেন, ‘সময় হলে জুলাই সাপোর্টারদের ঝুলাই ঝুলাই মারবে সাধারণ মানুষ।' এর জবাবে অধ্যাপক ওয়াহেদ চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘অনেক জুলাই যোদ্ধা আবেগে গেছে, বিবেকে যায় নাই। তাদেরকে মাফ করে দিবে।’
আবার তার এ পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর চবি শাখা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ সংগঠন) সাবেক সভাপতি রেজাউল হক রুবেল নিজের ফেসবুক আইডিতে লেখেন, ‘আপনি আমাদের আইকন, স্যার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় আপনি সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। স্যালুট, স্যার।’
জানা যায়, ২০২২ সালে সহকারী প্রক্টর থাকাকালীন পরিবহনসংক্রান্ত দাবিতে আয়োজিত একটি মানববন্ধন থেকে এক শিক্ষার্থীকে প্রক্টর অফিসে তুলে নিয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখানে অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী তাকে শিবির-সংশ্লিষ্ট বলে গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচার, দমন-পীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক অধ্যায়। এই আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ শহীদ হয়েছেন, হাজারো মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাই জুলাইকে বা এই আন্দোলনের প্রতীক ও চেতনাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা অত্যন্ত দুঃখজনক। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, আমি ফেসবুককে মূলত একটি ‘ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে দেখি এবং সেখানে ব্যক্তিগতভাবে স্যাটায়ার, হাস্যরস ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পোস্ট করি। আমি বাস্তব জীবনে একজন শিক্ষক, কিন্তু ফেসবুকে একজন সাধারণ ব্যবহারকারী। সেখানে আমি মূলত মজা বা স্যাটায়ারধর্মী পোস্ট করি।
এ শিক্ষকের দাবি, আলোচিত পোস্টে তিনি জুলাই সিডিআই বলেননি। তিনি বলেন, আমি বলেছি অনেকে জুলাইয়ের সাথে ৭.৬২ বুলেটের রিলেশন খোঁজে, জুলাইয়ের সাথে সুইস ব্যাংকের রিলেশন খুঁজতেছে। এগুলো কোনোটাই আমার কথা না। এগুলো মানুষ বলে। আমি শেষে লিখেছি, সিডিআই-টা কেন বলবেন?
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে নিহতদের স্মৃতি বা তাদের পরিবারের অনুভূতিতে আঘাত করার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না। যদি আমার পোস্টে কেউ, বিশেষ করে জুলাইয়ের শহীদদের স্বজনরা কষ্ট পেয়ে থাকে, তবে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জুলাই নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করা উচিত নয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে জুলাইকে ধারণ নাও করতে পারে, তবে জুলাইয়ের মাসেই এমন মন্তব্য অবমাননাকর। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এছাড়া প্রশাসনকে বলবো দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টি তদন্ত করে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হোক।
এ বিষয়ে জানতে শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি হাবিবুল্লাহ খালেদ বলেন, আমরা মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিচারহীনতার কারণে আজকে এ ধরনের লোকদের আস্ফালন দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ের মাসেই জুলাই নিয়ে এ ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য মেনে নেওয়া হবে না। প্রশাসনের কাছে স্পষ্টভাবে বলতে চায়, অনতিবিলম্বে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ একাডেমিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, এ বিষয়ে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।