১২ জুলাই ২০২৬, ২০:৫৫

জুলাইয়ের পক্ষে থাকায় রাবি অধ্যাপককে হত্যার হুমকি

অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন  © সৌজন্যে প্রাপ্ত

সেলিম রেজা নিউটন দীর্ঘদিন ধরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, লেখক ও জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে তিনি বহুবার সরব হয়েছেন।

২০২৪ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও হামলার অভিযোগ উঠছিল, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

তার এই ভূমিকার কারণে তিনি ব্যাপক প্রশংসা যেমন পেয়েছেন, তেমনি পরবর্তীকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা, অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত আক্রমণেরও মুখোমুখি হন। আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই তাকে এবং তার পরিবারকে লক্ষ করে ধারাবাহিক অনলাইন হয়রানি, হত্যার হুমকি ও কুৎসা রটানো শুরু হয়, যা এখনও বিভিন্ন সময়ে অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি এক জাতীয় দৈনিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমার ইনবক্স ভরে গেছে হত্যার হুমকি, গালাগালি আর অশ্লীল বার্তায়। শুধু আমাকে নয়, আমার স্ত্রী, কন্যা, বোনসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়েও নোংরা ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। এমনকি কোথায় থাকি, কোন পথে চলাফেরা করি—এসব খোঁজ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রকাশ্যে পোস্ট করা হচ্ছে। এই অনলাইন আক্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সমন্বিতভাবে পরিচালিত একটি প্রচারণার অংশ, যার লক্ষ্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক ও মানসিকভাবে চাপে রাখা।

তিনি বলেন, আমার পরিবারের সদস্যরাও এই প্রচারণা থেকে রেহায় পাচ্ছেন না। আমার কন্যা, স্ত্রী, বোন—সবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে গিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করা হচ্ছে। তাদের ছবি বিকৃত করা হচ্ছে। ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা ধরনের সহিংস হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এগুলো শুধু অনলাইন ট্রল নয়; এগুলো মানসিক সন্ত্রাস। আমার পরিবারের জন্য এটা ভয়াবহ মানসিক চাপের বিষয়। একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রত্যাশা, এ ধরনের প্রকাশ্য সহিংস উসকানি ও হুমকির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিউটন অভিযোগ করে বলেন, আমার ১৪ গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে পোস্ট করা হচ্ছে। কোথায় থাকি, কার সঙ্গে চলাফেরা করি—এসব তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এগুলো আন্তর্জাতিকভাবে ‘ডক্সিং’ নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হলো একজন মানুষকে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া। এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল অনলাইন হয়রানি নয়, বরং বাস্তব জীবনে হামলা বা সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করে।

তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে প্রচারণা চলছে, সেটার মূল লক্ষ্য আমি নই। মূল লক্ষ্য হচ্ছে জুলাইকে অস্বীকার করা, জুলাইয়ের ইতিহাসকে বিকৃত করা এবং মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করা।বছরখানেক ধরে অনলাইনে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে একটা খুবই কনফার্টেড একটা কো-অর্ডিনেটেড একটা প্রোপাগান্ডা চলছে। প্রচুর টাকা খরচ করে প্রচুর মানুষকে অনলাইনে বসিয়ে রেখে ভাড়া দিয়ে এই ভারতের লোকজনদেরকে দিয়ে একটা জুলাইয়ের বিরুদ্ধে একটা ক্যাম্পেইন চলছে।

জুলাই যেন ঘটেনি, জুলাই একটা মিথ্যা, জুলাই একটা অলিক এইরকমের একটা অলিক প্রোপাগান্ডা, একটা প্রজেক্ট চলছে। এটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে এই প্রজেক্টটা একেবারে শেখ হাসিনার এবং তার পুত্র জয় তাদের ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে চলছে। এটা একেবারেই পতিত পলাতক হাসিনা এবং তার রাজনৈতিক এবং পারিবারিক বংশধরদের একটা প্রজেক্ট। যেকোনো মূল্যে হোক জুলাইয়ের গায়ে কালি মাখাতে হবে। তারা যে গোটা জুলাই মাস ধরে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেছে সেটা সারা দুনিয়া দেখেছে। সেই জিনিসটাকে তারা অস্বীকার করতে চাচ্ছে। একদম পিওর ফ্যাসিস্ট অ্যাটিচিউড।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো এসব হুমকি এবং সাইবার বুলিং করছেন নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুসারীরা। ফেসবুকে তাদের পরিচয় পাওয়া না গেলেও বেশিরভাগের ফেসবুক প্রোফাইলে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা ছাত্রলীগের লোগো দেওয়া। এতে বোঝা যায় তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। 

নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাবিব জাকারিয়া বলেন, এগুলো খুবই সুপরিকল্পিত। আমি মনে করি যে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে যারা ছিলেন তারা  এই হ্যারেজমেন্টটা করছে। তারা নানাভাবে হ্যারেজ করার চেষ্টা করছে। নিউটনকে এভাবে হ্যারেজ করাটা বোকামির কাজ, খুবই নির্বোধের কাজ। নিউটন আজকালকের লড়াকু লোক না, তিনি সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে। 
তাঁর ইতিহাস মোটামুটি সবাই জানে। সেহেতু তাঁর সাথে এইগুলো করে কোনো লাভ হবে না। নিউটনের তার ছাত্র অবস্থা থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটা ন্যায্য বিষয়ে তাঁর যে ভূমিকা ছিল, ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তা সবার জানা।

তিনি আরও বলেন, এই যে হ্যারাসমেন্ট, এটা আমরা বুঝতেই পারছি কারা করছে। তো আমাদের এখানে তো এগুলো নিয়ে বিশেষ করে অনলাইনের ব্যাপারে কোনো ওরকম কোনো আইনগত জায়গা নেই। এটা কখনোই কাম্য নয়। রাষ্ট্রকে এই জায়গায় পৌঁছাতে হবে। আশা করি গভর্নমেন্ট বিষয়গুলো বুঝতে পারবেন এবং তার নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। 

ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, যেকোনো ধরনের নোংরামি সমর্থন করার কোনো সুযোগ নেই। আমি যেকোনো মানুষের উপরেই যদি কোনো সাইবার বুলিং  হয়, যেকোনো মানুষকে যদি হত্যা হমকি দেওয়া হয়, সেটা কখনোই কাম্য নয়। আমরা ওইরকম একটা সমাজ কখনোই চাইনা। সেলিম রেজা নিউটন একটা ব্যক্তি নয় আমি মনে করি সে একটা প্রতিষ্ঠান। নিউটন নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করেছে, এখন একটা বড় প্রতিষ্ঠান যত হবে তত বাতাস তার গায়ে লাগবে, ঝাপটা তার বেশি আসবে।

তিনি আরও বলেন, আমি যতটুকু জানি সে এ জাতীয় হুমকি ধামকি বা সাইবার বুলিংকে আমলে নেন না। আমলে নেওয়ার মতো মানে মানুষ উনি নন। বিষয়গুলো যারা করছে তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারণ এই করে নিউটনকে কোনোভাবে দমানো যাবে না। প্রতিটা সময়ে নিউটনের বিপক্ষে একটা শক্তি দাঁড়িয়েছে। কোনো সময় রাষ্ট্র শক্তি দাঁড়িয়েছে। কোনো সময় রাজনৈতিক শক্তি দাঁড়িয়েছে। তিনি তো অন্য কারোর মতো নন। তিনি যেটা বিশ্বাস করেন, যেটা বলেন সেটা তিনি করেন। তার শত্রু অনেক, তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে খালি পলিটিক্যাল পার্টি না, রাষ্ট্রও তার বিরুদ্ধে কাজ করছে।

তিনি বলেন, আমি এই বিষয়গুলোর নিন্দা জানায়। যেকোনো কারণে কারোর ছেলেমেয়ে, পরিবারের উপরে আঘাত এটা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। এ জাতীয় আঘাতগুলো কোনোভাবে কাম্য নয়। যারা এটা করছে তাদের শাস্তির আয়তায় আনা উডিত। এখন সময় এসেছে এখন যদি তাদের শাস্তির আয়তাও না আনা হয় তাহলে আর কবে হবে এতগুলা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আমরা যে বাংলাদেশ চেয়েছিলাম সেটা পাইনি। রাষ্ট্রের একটা দায়িত্ব আছে, সরকারের একটা দায়িত্ব আছে। উনাকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তার বিরুদ্ধে যারা এগুলো করছে সেগুলো ক্ষতিয়ে দেখা উচিত এবং শাস্তির আওতায় আনা উচিত। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, আমিও বিষয়টা ফেসবুকে দেখেছি। তবে তিনি কোনো অভিযোগ বা এ ধরনের কিছু আমাদেরকে জানাননি। এছাড়া সাইবার বুলিং একটা ওয়াইড এরিয়া, এখানে আসলে সুনির্দিষ্ট দোষীকে আইডেন্টিভাই করা কঠিন। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর অভিযোগটা জরুরি। তিনি যদি অভিযোগ করেন তাহলে আমরা বিষয়টা দেখতে পারি।  দেশের বাহিরে বা অন্য কেউ হলে সেক্ষেত্রে আমাদের তো সেই মেকানিজম নাই। তাকে কে কোথা থেকে কি বলছে তা বের করা আমাদের জন্য কষ্টকর। তবে তিনি সাহায্য চাইলে আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করব।