ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছ আছে ১৭ হাজার ১৬১টি, প্রজাতি ২৭৭
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রথমবারের মতো পরিচালিত সমন্বিত বৃক্ষ শুমারি ২০২৫-এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ শুমারির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বৃক্ষসম্পদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, পরিবেশগত অবদান, কার্বন মজুদ, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং স্থানিক অবস্থানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বৈজ্ঞানিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শুমারির ফলাফলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৬২টি গোত্রের ২৭৭টি প্রজাতির মোট ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ রয়েছে। প্রজাতির ভিত্তিতে ৫৮ শতাংশ দেশি এবং ৪২ শতাংশ বিদেশি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। তবে বৃক্ষ সংখ্যার ভিত্তিতে দেশি ও বিদেশি বৃক্ষের অনুপাত যথাক্রমে ৫৪ শতাংশ ও ৪৬ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ শুমারির ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
এ সময় জানানো হয়, সর্বাধিক আধিক্যসম্পন্ন ১৫টি বৃক্ষ প্রজাতির মধ্যে পাঁচটি বিদেশি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে মেহগনি, দেবদারু, ম্যাকারথুরি পাম, রেইনট্রি এবং সেগুন উল্লেখযোগ্য। শুমারি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বৃক্ষসমূহের মোট ভূ-উপরিভাগীয় জীবভর ৯ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন এবং ভূ-নিম্নীয় জীবভর ২ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন।
এসব বৃক্ষের মাধ্যমে মোট ৪,৬৫০ মেট্রিক টন কার্বন মজুদ রয়েছে। জীবভরের ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি বৃক্ষের অবদান যথাক্রমে ২১.৫ শতাংশ এবং ৭৮.৫ শতাংশ। উপযোগিতার ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষসম্পদের মধ্যে ফলদ বৃক্ষ ২৫ শতাংশ, প্রাণিকূল সহায়ক বৃক্ষ ২২ শতাংশ, ঔষধি বৃক্ষ ২১ শতাংশ, কাঠ উৎপাদনকারী বৃক্ষ ২০ শতাংশ এবং শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ ১২ শতাংশ।
বৃক্ষের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে মোট ১ হাজার ৮১১টি বৃক্ষকে বিভিন্ন মাত্রার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে এবং ২ হাজার ২১৩টি বৃক্ষকে সম্ভাব্য বৃক্ষজনিত বিপর্যয় ( Tree Hazard) শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এবং আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ইকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ-এর যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বৃক্ষ শুমারির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বৃক্ষসম্পদ সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ সবুজায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি পরিবেশবান্ধব ও দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ সম্প্রসারণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সবুজ, নান্দনিক ও টেকসই ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আরও পড়ুন: প্রাথমিকে ৭৪ হাজার ৬৭৮ পদে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বড় সুখবর দিলেন শিক্ষামন্ত্রী
তিনি বলেন, পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি ক্যাম্পাসে পরিণত করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থীরা নির্মল পরিবেশে স্বস্তির সঙ্গে চলাচল করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ সংরক্ষণ, ফলজ ও উপকারী গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষ শুমারি ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই সবুজায়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বায়ুদূষণ সহনশীল দেশীয় বৃক্ষরোপণ, জলাধার সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই ক্যাম্পাস গঠনে বৃক্ষ শুমারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তিনি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ গাছ চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পর্যায়ক্রমে নতুন বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে পরিচালিত এ শুমারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে পাঁচটি প্রধান জরিপ একক এবং ৪৫টিরও বেশি উপ-এককে বিভক্ত করে প্রতিটি বৃক্ষের তথ্য Direct Measurement Method অনুসরণ করে সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, জীবভর ( Biomass), কার্বন মজুদ এবং অন্যান্য সূচক নিরূপণ করা হয়। একইসঙ্গে Google My Maps এবং ArcGIS -এর সহায়তায় একটি উন্মুক্ত, ডিজিটাল ও মানচিত্রভিত্তিক বৃক্ষ ডাটাবেজও তৈরি করা হয়েছে।