ঢাবির সিনেটে দুই বিরোধীদলীয় এমপিকে মনোনয়ন দেয়ার প্রস্তাব সামিনা লুৎফার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিনেট অধিবেশনে অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলেছেন, ‘৭৩-এর আদেশের ২০-এর ১,‘ই’ ধারা অনুযায়ী সিনেটের সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকার কর্তৃক পাঁচজন সংসদ সদস্যকে (এমপি) মনোনয়ন দেওয়া হয়। আমার প্রস্তাব হচ্ছে এ পাঁচজনের মধ্যে বিরোধী দল থেকে অন্তত দুজন সংসদ সদস্য কেন থাকবে না? সে ব্যবস্থা করা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, উপস্থিত পাঁচজন সংসদ সদস্য, যারা সিনেট সদস্য হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন, তারা সবাই পুরুষ।’
ইনক্লুসিভ জায়গায় জেন্ডার ইনক্লুসিভিটি এবং অন্যান্য ইনক্লুসিভিটি সমপরিমাণে দিতে চান বলেও জানান তিনি। সোমবার (২৯ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে এ প্রস্তাব করেন ঢাবি অধ্যাপক।
সিনেট অধিবেশনে সামিনা লুৎফা বলেন, ‘সিনেটকে আরও বেশি ইনক্লুসিভ করার জন্য আমার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আছে। কারণ আমাদের ৭৩-এর আদেশ অনুযায়ী সিনেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। কাজেই সিনেটের ওপরে আমলাতান্ত্রিক এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানো শিক্ষক হিসেবে আমাদের অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম বা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ কমানোর জন্য কিছু চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের প্রয়োজন রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বাজেট নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু আমার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা বিষয়ে ৭৩-এর আদেশ অনুযায়ী, যে অথরিটিস বা কর্তৃপক্ষ রয়েছে, সেই তালিকায় আমরা দেখতে পাই, সেখানে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট কমিটি (এসএমটি) এবং অ্যাডভাইজরি কমিটি নেই। অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গত প্রশাসনের (নিয়াজ আহমেদ) সময় আমরা সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট কমিটির কথা অনেক শুনেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘উপাচার্যের কাছে আমার প্রশ্ন, এই দুটি কোনো বৈধ কর্তৃপক্ষ না হওয়ার পরও কীভাবে টিকে রয়েছে বা আদৌ আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে এটা কেন বিলোপ করা হবে না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর সিনেট তার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। এখানে যারা আসবেন তারা যেন অনেক বেশি ইনক্লুসিভ হয়। আমরা কাউকে বৈষম্যের শিকার করতে চাই না। আমাদের (নারী) সংখ্যা আসলেই অনেক কম।’
উপাচার্যের বিশেষ ক্ষমতা সম্পর্কে সামিনা লুৎফা বলেন, ‘উপাচার্যের বিশেষ ক্ষমতার একটা পরিধি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ আমরা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান উত্তর পরিস্থিতিতে নানান রকম কিছুর (সমস্যার) সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি সামলানোর জন্য সব সময় পুরো জিনিসটা খোলা রেখে দিলে অনেক ধরনের অনিয়ম হবার সম্ভাবনা চলে আসে। যেটা আমরাও এক্সপেরিয়েন্স করেছি। সে কারণে আমার প্রস্তাব হচ্ছে, উপাচার্যের বিশেষ ক্ষমতা যদি ক্যালামিটি অনুযায়ী থাকেও, সেটার পরিধি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেটা সম্পূর্ণভাবে ওপেন থাকা উচিত না।’
গবেষণা বরাদ্দ নিয়ে সিনেট অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘যেহেতু গবেষণার বরাদ্দই নেই, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি সরকারের এই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিরোধীতা করি। বাংলাদেশের শিক্ষা বা জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে এমন কিছু করা সম্ভব নয়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণায় কোনো বরাদ্দ থাকবে না। সুতরাং গবেষণার বরাদ্দটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে থাকতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছে নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা গবেষণার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ফান্ডের আবেদন করেন। নানান রকম কম্পিটিশনে অংশ নিয়ে ফান্ড আনেন। কিন্তু এই ফান্ড পাওয়ার যে প্রক্রিয়া, তার মধ্যে অনেক প্রশাসনিক দায়িত্ব ও কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় এ কাজগুলো করার জন্য। আমরা রিসার্চ করি। তারপর রিসার্চের ব্যাপারে অডিটের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের শিক্ষকদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ কাজগুলো করতে হয়, যা পৃথিবীর কোথাও হয় না।’
শিক্ষক নিয়োগ বিষয়ে সামিনা লুৎফা বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব দেখতে পাই, যা এক ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আসে। এই রাজনৈতিক প্রভাবকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মধ্যে আনার জন্য আমার প্রস্তাব হচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে চ্যান্সেলরের মনোনীত প্রতিনিধি যাদেরকে পাঠানো হয়, তারা সাধারণত সরকারের এক ধরনের প্রভাব নিয়ে আসে। শিক্ষক নিয়োগে তাদের থাকার দরকার নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া সাবজেক্ট এক্সপার্ট হিসেবে যাদেরকে রাখা হয়, সেই সাবজেক্ট এক্সপার্ট কে হবেন কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটাও বিভাগ এবং ফ্যাকাল্টি পর্যায় থেকে আসা উচিত। সেটার একটা সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং পরিধি থাকা উচিত, যাতে যে কেউ এক্সপার্টের নাম দিয়ে এসে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে হাজির হতে না পারেন।’