৩০ মে ২০২৬, ১১:৫৭

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিতর্ক, শিক্ষা-গবেষণায় নিজেদের অবস্থান জানাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়   © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে 'কোচিং সেন্টার' ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা নিয়ে বির্তর্কিত মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংগঠনসহ ডাকসু ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের সরাসরি প্রতিবাদ না জানালেও শিক্ষা-গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তুলে ধরেছেন। 

শনিবার (৩০ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, শিক্ষা ও গবেষণায় অসাধারণ উৎকর্ষ সাধনের জন্য বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিকভাবে অগ্রগতি অর্জন করে চলেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী Times Higher Education (THE) প্রকাশিত এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৩০১-৩৫০ স্থানে অবস্থান করছে। ২০২৫ সালে এই অবস্থান ছিল ৪০১-৫০০-এর মধ্যে।

গত ২৩ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সর্বশেষ এই র‍্যাঙ্কিংয়ে এশিয়ার ৩৬টি দেশের মোট ৯২৯টি বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে শীর্ষস্থান অর্জন করে।

র‍্যাঙ্কিংয়ের বিভিন্ন সূচকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। গতবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্কোর ছিলো ৩১.৫-৩৪.৩। এবছর তা বেড়ে ৩৮.৩-৪০.১-এ উন্নীত হয়। এছাড়া, গবেষণার পরিবেশ সূচকে ১২.০ থেকে বেড়ে ১৫.৭, গবেষণার মান সূচকে ৫৮.৮ থেকে বেড়ে ৭৪.৩ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ সূচকে ২১.৪ থেকে বেড়ে ৩৩.২ হয়। এই অগ্রগতি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বৈশ্বিক বিভিন্ন র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য দৃশ্যমান হয়েছে। র‍্যাঙ্কিংয়ের এই ধারাবাহিক সাফল্য তুলে ধরা হলোঃ

ক) টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গতবারের তুলনায় ২০০ ধাপ এগিয়ে ৮০০-১০০০ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া, কিউএস বিষয়ভিত্তিক টেকসই (Sustainability) র‍্যাঙ্কিংয়ে অংশগ্রহণ করে বিশ্বসেরা টেকসই বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ স্থান অধিকার করে। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬৩৪তম স্থান লাভ করে।

খ) যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্বখ্যাত শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (QS) প্রকাশিত ২০২৬ সালের ‘QS World University Rankings 2026’ তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নেয়। এবারের র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৫৮৪তম, যা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে।

গ) কিউএস বিষয়ভিত্তিক বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্থান পায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি বিভাগ। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ক্যাটাগরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গতবছরের তুলনায় এবছর ১০০ ধাপ এগিয়ে বিশ্ব র্যা ঙ্কিংয়ে ৪০১ থেকে ৪৫০ এর মধ্যে, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ ৫৫১ থেকে ৬০০ এর মধ্যে, ইঞ্জিনিয়ারিং-ইলেক্ট্রিক্যাল এবং ইলেক্ট্রনিক বিভাগ ৫০১ থেকে ৫৫০ এর মধ্যে, ইঞ্জিনিয়ারিং-মেকানিক্যাল, এরোনেটিক্যাল বিভাগ ৫০১ থেকে ৫৭৫ এর মধ্যে অবস্থান করছে। 

সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ক্যাটাগরিতে গত বছরের তুলনায় ৫০ ধাপ এগিয়ে বর্তমানে সারাবিশ্বে ৪০১ থেকে ৪৫০ এর মধ্যে অবস্থান করছে। এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত একাউন্টিং অ্যান্ড ফিন্যান্সে বিভাগ ২৫১ থেকে ৩০০ এর মধ্যে, বিজনেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ ৪০১ থেকে ৪৫০ এর মধ্যে, ইকোনমিক অ্যান্ড ইকোনমেট্রিক্স বিভাগ ৩৫১ থেকে ৪০০ এর মধ্যে, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ৩০১ থেকে ৩৭৫ এর মধ্যে অবস্থান করছে। 
লাইফ সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন ক্যাটাগরিতে মেডিসিন বিভাগ ৬৫১ থেকে ৭০০ এর মধ্যে অবস্থান করছে। ন্যাচারাল সায়েন্স ক্যাটাগরিতে ফিজিক্স অ্যান্ড এস্ট্রানোমি বিভাগ ৫৫১ থেকে ৬০০ এর মধ্যে অবস্থান করছে। আর্টস অ্যান্ড হিউমেনিটিস ক্যাটাগরিতে ৫০১ থেকে ৫৫০ এর মধ্যে অবস্থান করছে। 

ঘ) দ্বিতীয়বারের মতো প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশন ইন্টারডিসিপ্লিনারি সায়েন্স র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের ৯৪টি দেশের ৯১১টি বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে ৫২তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঙ) বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশের সংখ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষস্থান অধিকার করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্কোপাস ডাটাবেজের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ’ ম্যাগাজিন এই তথ্য প্রকাশ করে।

চ) কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাতঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে শীর্ষ স্থান অধিকার করে। এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ১১২তম।

ছ) অসাধারণ গবেষণাকর্মের জন্য প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষক ও গবেষক বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পান। এই তালিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ার প্রকাশ করে। এসব অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও একাডেমিক উৎকর্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আরও সুদৃঢ় করে।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিক অগ্রগতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, গবেষণার মান, গবেষণা পরিবেশ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ সূচকে সার্বিক উন্নতি আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ইঙ্গিত। আমরা বিশ্বাস করি, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিগগিরই বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আরও সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার উৎকর্ষ সাধনে আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি। তিনি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে নিরলসভাবে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।