বিশ্বের শীর্ষ গবেষক ও বিজ্ঞানীর তালিকায় ঢাবির বহু শিক্ষক আছেন— ববি হাজ্জাজের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ডাকসু
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি এক পডকাস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’, ‘চা-চপ-সিগারেট বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং শিক্ষকদের গবেষণা ‘প্লেজারাইজড’, ‘শিক্ষার্থীরা সরকারি অর্থে ভাঙচুর করে’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা দায়িত্বজ্ঞানহীন, বাস্তবতা বিবর্জিত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকদের প্রতি চরম অসম্মানজনক।
শুক্রবার (২৯ মে) প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বিবৃৃতি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।
বিবৃতিতে বলা হয়, একটি দায়িত্বশীল সাংবিধানিক পদে থেকে এ ধরনের সাধারণীকরণ ও অবমাননাকর বক্তব্য শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে হেয় প্রতিপন্ন করার শামিল। সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে ডাকসু।
ডাকসুর দাবি, সরকারের দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে নেতিবাচকভাবে মুখোমুখি দাঁড় করানো অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের প্রশ্নে যদি সত্যিকারের উদ্বেগ থেকে থাকে, তবে সেই আলোচনার শুরু হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে মেধা, গবেষণা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন, দলীয়করণ এবং সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো কর্তৃক গণরুম-গেস্টরুম নির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অ্যাকাডেমিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সাম্প্রতিক সময়েও বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের প্রবণতা অব্যাহত রেখেছে, যা উচ্চশিক্ষার স্বাধীন ও গবেষণাভিত্তিক পরিবেশকে আরও সংকুচিত করছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সমগ্র শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমাজকে দায়ী করা দায়িত্বশীল আচরণের পরিচায়ক নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার জন্য সবচেয়ে বেশি দায় রাষ্ট্রের নীতিগত অবহেলা ও অপর্যাপ্ত বরাদ্দ। দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, আধুনিক ল্যাব, গবেষণা সহায়ক নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানের অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বমানে পৌঁছেছে, কিন্তু বাংলাদেশে বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই ধরনের সহায়তা থেকে ধারাবাহিকভাবে বঞ্চিত হয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন।
বিশ্বের শীর্ষ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষকও আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং, গবেষণা প্রকাশনা, অ্যাকাডেমিক বৈচিত্র্য, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও সামাজিক অবদানের দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
ডাকসুর বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে একাংশ রাজনীতিতে সক্রিয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত জাতির প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছে, অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ‘সরকারি টাকা নষ্ট করে ভাঙচুর’ বলা সেই ইতিহাস ও আত্মত্যাগকে অপমান করার শামিল।
এছাড়া, প্রতিমন্ত্রী যেসব প্লেজারিজমের উদাহরণ দিয়েছেন, সেগুলো আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের আমলের গুটিকয়েক শিক্ষকের ক্ষেত্রে সীমিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ হাজারের অধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সেই অপরাধ চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায় ও দূরভিসন্ধিপূর্ণ। সরকারি দায়িত্বে থেকে এ ধরনের সাধারণীকরণ একজন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদার পরিপন্থি। এরূপ বক্তব্য দিয়ে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের পক্ষে একজন প্রতিমন্ত্রী 'ওকালতি' করতে পারেন কিনা সেটি পর্যালোচনার দাবি রাখে।
একজন প্রতিমন্ত্রীর কাজ কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা চালানো নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, দলীয়করণ বন্ধ, মেধাভিত্তিক প্রশাসনিক নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অ্যাকাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিতে প্রতিমন্ত্রীর ও সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ডাকসুর আহ্বান, প্রতিমন্ত্রী ভবিষ্যতে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকবেন এবং পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ বৃদ্ধি, দলীয়করণ বন্ধ ও কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।