২৬ মে ২০২৬, ২১:১৬

বান্ধবীকে মেসে নিয়ে মারধরের শিকার, গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিলেন ছাত্রদল নেতা

ছাত্রদল নেতা আব্দুল্লাহ আল সাকিফ রহমান  © টিডিসি সম্পাদিত

রাতে বান্ধবীকে মেসে নিয়ে মারধরের শিকার হওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল সাকিফ রহমান থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। গতকাল সোমবার (২৫ মে) হাটহাজারী মডেল থানায় এই অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দেওয়া অভিযোগপত্রে অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে বিবাদী করেছেন তিনি।

হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অভিযোগে বিবাদীরা হলেন— বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী জোবরা গ্রামের আবদুল মান্নানের ছেলে মো. রায়হান (৩৫), মৃত আজিজুল হকের ছেলে বাচা সওদাগর (৫৫), মো. মানেকের ছেলে মো. নয়ন (২২), মো. নুরুর ছেলে মো. জাবেদ (২৭), ফজল করিম প্রকাশ সরইয়ের ছেলে মো. সজীব (২২), মো. ইয়াকুবের ছেলে মো. আমজাদ (৩০), মো. তৈয়বের ছেলে মো. হাসান প্রকাশ আরমান (৩০), বাচা সওদাগরের ছেলে মো. বক্কর (৩৫) এবং মো. আনাস (২২), মো. সাজিদুল (২১) ও মো. আহসান (২৩)।

ছাত্রদল নেতা সাকিফ রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। গত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-চাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে আইন বিষয়ক সম্পাদক পদে লড়াই করেন। ৫ আগস্টের আগে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। এদিকে বান্ধবীকে মেসে নিয়ে মারধরের শিকার হওয়ার পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ সাকিফ রহমানকে বহিষ্কার করেছে ছাত্রদল। 

আরও পড়ুন: বান্ধবীকে মেসে নিয়ে স্থানীয়দের মারধরের শিকার চবি ছাত্রদল নেতা

অভিযোগপত্রের দীর্ঘ বিবরণে বলা হয়, আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২নং গেটের পাশে জে এম টাওয়ারের বিপরীতে একটি নির্মাণাধীন তিন তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে আমার দুই বন্ধুর সাথে ভাড়া থাকি। গত ২৩ মে আমার এক বান্ধবী বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে আনুমানিক রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে বের হয়। তার সাথে থাকা প্রয়োজনীয় ব্যাগগুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২নং গেট বাজারে আসার পর আমি তার ব্যাগগুলো আমার বাসায় রেখে তাকে নিয়ে একসাথে ডিনার খেতে যাই। ডিনার শেষ করে রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। যেহেতু আমার নিজের বাড়ি চট্টগ্রাম শহরে, তাই তাকে ভোরের ট্রেনে তুলে দিয়ে আমার বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ছিল। আমার নিজের জামাকাপড় গোছানো না থাকায় ব্যাগটি আনতে আমি পুনরায় আমার ওই বাসায় যাই।

তিনি আরও বলেন, আমরা যখন বাজার থেকে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম, তখন স্থানীয় জোবরা এলাকার বাসিন্দা ও বিবাদীরা আমাদের অনুসরণ করতে শুরু করে। পূর্বে জোবরা এলাকার বাসিন্দাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি সংঘর্ষের সময় বিবাদীরা আমার বাইকটি ভাঙচুর করেছিল এবং পরবর্তীতে আমাকে বিভিন্নভাবে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। আমি যখন বাসার গেটের সামনে পৌঁছাই, তখন বিবাদীরা আমাদের চারপাশে এসে সন্দেহজনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের আচরণ দেখে আমার মনে সংশয় জাগে এবং আমার বান্ধবীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাকে বাইরে না রেখে আমার বাসায় এসে বসার অনুরোধ করি।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এই ছাত্রদল নেতা বলেন, আমার বান্ধবী বাসায় গিয়ে বসার পর আমি বের হওয়ার জন্য ফ্রেশ হয়ে রেডি হচ্ছিলাম। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বিবাদীরা আমার বাসার দরজার সামনে এসে জোরে জোরে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। আমি দরজা খুলে এগিয়ে গিয়ে তাদের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে এবং উত্তেজিত হয়ে আমাকে মারতে উদ্যত হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিই।

আরও পড়ুন: বান্ধবীকে মেসে নিয়ে বহিষ্কার চবি ছাত্রদলের সেই যুগ্ম সম্পাদক

এরপর বিবাদীরা দরজার সামনে জড়ো হয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে একটি ‘মব’ সৃষ্টি করে। তারা আমাদের জিনিসপত্র ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে দরজা ভেঙে জোরপূর্বক আমার বাসায় প্রবেশ করে এবং আমাকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে কয়েকজন বিবাদী লাঠি নিয়ে আমাকে পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করে। বিবাদীদের এই তাণ্ডব দেখে আমার বান্ধবী ভয়ে বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নেয়। মারধরের একপর্যায়ে কয়েকজন বিবাদী জোরপূর্বক আমার প্যান্ট ও শার্ট খুলে ফেলে এবং মোবাইলে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। আমি এর প্রতিবাদ করতে গেলে তারা আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় এবং আরও বেশি মারধর করে। এরপর বিবাদীরা বাথরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। বাথরুমে থাকা অবস্থায় একজন বিবাদী আমার বান্ধবীর ভিডিও ধারণ করে এবং কয়েকজন মিলে তাকে টেনেহিঁচড়ে বাথরুম থেকে বাইরে নিয়ে আসে। তারা আমার বান্ধবীর হাত ধরে টানাটানি করে তার শ্লীলতাহানি করে এবং সেই দৃশ্যও মোবাইলে ভিডিও করে।

এই সময় ১নং বিবাদী (মো. রায়হান) জোরপূর্বক আমার বান্ধবীর ট্রাভেল ব্যাগটি কেড়ে নেয়, যার ভেতরে একটি লেটিনো ল্যাপটপ (Model: Lenovo IP Slim Intel Core i3, S/N: PF5V29MD), নগদ ১০ হাজার টাকা এবং তার জামাকাপড় ছিল। আমি তাকে বাধা দিতে গেলে ২, ৩, ৪, ৫ ও ৬নং বিবাদীসহ বাকিরা আমাকে এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে গুরুতর জখম করে। বিবাদীদের মারধরের চোটে আমি একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়ি। আমি জ্ঞান হারালে বিবাদীরা আমার রুমে থাকা প্লাস্টিকের র‍্যাক থেকে আমার মানিব্যাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং আমার নিজের ব্যবহৃত একটি এইচপি ল্যাপটপ (Model: HP EliteBook) ছিনিয়ে নেয়। বাসা থেকে চলে যাওয়ার সময় তারা হুমকি দিয়ে বলে যায় যে, এই ঘটনা নিয়ে যদি থানা বা আদালতে কোনো মামলা করা হয়, তবে আমাকে এবং আমার বান্ধবীকে প্রাণে মেরে লাশ গুম করে ফেলা হবে।

আরও পড়ুন: ছাত্ররাজনীতি না চাওয়া সেই শিক্ষার্থী লড়বেন চাকসুর আইন সম্পাদক পদে

সাকিফ রহমান আরও লিখেছেন, পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, নিরাপত্তা প্রহরী এবং আমাদের কয়েকজন সিনিয়র-জুনিয়র ভাই-বোন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন এবং কৌশলে বিবাদীদের হাত থেকে আমাদের উদ্ধার করেন। ঘটনার পর বিবাদীরা আমার ও আমার বান্ধবীর ধারণকৃত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছে, যা আমাদের চরম মানহানি ঘটিয়েছে। এই মুহূর্তে যদি এই বিবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে তারা ভবিষ্যতে আমি ও আমার বান্ধবীর বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদল নেতা আব্দুল্লাহ আল সাকিফ রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, পরিকল্পিতভাবে এলাকার কিছু ছেলে মব সৃষ্টি করে মারধর করে ল্যাপটপ, মানিব্যাগ, টাকাসহ সব কিছু ছিনতাই করে উল্টো মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। আমি আইনের ছাত্র, অথচ মারধর ঘটনার আকস্মিকতায় আমার মেয়ে বন্ধু মানসিক ভেঙ্গে পড়ায় আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি— কিভাবে কী করবো বুঝতে পারিনি। আমি আইনের আশ্রয় নিয়েছি। দোষীদের শাস্তি চাই, আমি দোষী হলে আমারও।

হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি। আমরা প্রয়োজনীয় তদন্ত করব।