ঢাবিসহ চার স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ব্যতিক্রম যেখানে রাবি
অ্যাকাডেমিক ও চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আবাসিক হলে থাকাটা জরুরি হয়ে পড়ে কিছু শিক্ষার্থীর। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ ছুটিতে হলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে প্রস্তুতির ব্যাঘাত ঘটে তাদের। তাই আবাসিক হলগুলো সবসময় খোলার পক্ষে তারা। দেশের স্বায়ত্তশাসিত চারটির মধ্যে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির মধ্যে হল খোলা রাখলেও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে এবারও ১১ দিনের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ১৭টি আবাসিক হল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আবাসিক হল বন্ধ করার কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে অনুরোধও করেছেন তারা।
জানা গেছে, দেশে চারটি পুরানো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে পরিচালিত এসব বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে— ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বছর মুজিব সরকার সংসদে বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদা করে এসব অধ্যাদেশ পাস করে। সেই সময়ের বাংলাদেশের ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অধ্যাদেশ প্রয়োগ করা হয়েছিল। অপর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়—বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েটে) স্বায়ত্তশাসনের বাহিরে ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত রবিবার (২৪ মে) দুপুর ১২টা থেকে আগামী ৪ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলসমূহ বন্ধ থাকবে। তবে বিশেষ প্রয়োজন হলে শিক্ষার্থীরা প্রাধ্যক্ষ বরাবর আবেদন করে হলে অবস্থান করতে পারবেন। গত বছর ঈদুল আজহার ছুটিতেও অনেক শিক্ষার্থী আবেদন করে হলে অবস্থান করেছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, একসময় ছুটিতে হল খোলা থাকত। এখন কেন বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং হলে থাকতে গেলেও কেন অনুমতি নিতে হচ্ছে? তারা বলছে, ঈদের কয়েক দিন পরেই কয়েকটি চাকরির পরীক্ষা আছে, ফলে বাসায় গেলে পড়ালেখার ব্যাঘাত ঘটবে। এজন্য হলে থাকাটা তাদের জন্য জরুরি।
এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন বলেন, আমাদের অনেকের সামনেই ব্যাংক ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা আছে। বাসায় গেলে পড়ার পরিবেশ থাকে না। হলে থাকলে লাইব্রেরি, বন্ধুদের সহযোগিতা ও নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যায়। তাই প্রস্তুতির প্রয়োজনে আমাদের মতো কিছু শিক্ষার্থীর হলে থাকাটা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর থেকে হল বন্ধের নিয়ম চালু হয়েছে। আগে তো এমন ছিল না। হলে থাকতে গেলে আমাদের আবেদন করে অনুমতি সাপেক্ষে থাকতে হবে কেন? এটা তো এক প্রকার পড়ালেখায় অসহযোগিতা।
আরেক শিক্ষার্থী আদিত্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস করার জায়গা নয়, এটা আমাদের আবাসও। ছুটিতে সবাই বাসায় যেতে পারে না, যাওয়ার সুযোগও থাকে না। অনেকের চাকরি পরীক্ষা ও অ্যাকাডেমিক পরীক্ষা আছে। হল থেকে বাসায় গেলে পড়ার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে না। তাই এভাবে দীর্ঘদিন ধরে হল বন্ধ রাখলে আমাদের মতো কিছু শিক্ষার্থীদের বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। প্রশাসনের এ বিষয়ে ভাবা উচিত।
হল বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. শাহ হুসাইন আহমেদ মাহদী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো আগেও বন্ধ থাকত। মাঝে কিছু বছর দুই-একটি ঈদে হয়তো খোলা ছিল। সে সময় বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে হল খোলা রাখা হয়েছিল। ঈদের ছুটিতে অনেক হলে মাত্র দুই-তিনজন শিক্ষার্থী অবস্থান করে, যা তাদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। এজন্য আবেদনপত্রের মাধ্যমে থাকতে বলা হয়েছে, যাতে কারা অবস্থান করছে সে বিষয়ে আমরা অবগত থাকতে পারি।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী হলে থাকার জন্য আবেদন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক আমীরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমি অবগত নই। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমার কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আশা করি ভালো ভেবেই নিয়েছেন। আমি তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বলেন, ছুটির সময় পুরো ক্যাম্পাস ফাঁকা থাকে। তাই নিরাপত্তাজনিত কারণে হল বন্ধ রাখতে হয়। তবে যারা থাকতে চায়, তাদের আবেদন করতে বলা হয়েছে যাতে আমরা জানতে পারি কারা অবস্থান করছে। পাশাপাশি ঈদের দিন হলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে। আবেদন তালিকা থাকলে সেটি সমন্বয় করাও সহজ হয়।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সময়গুলোতে আবাসিক হল বন্ধ নিয়ে আগেও রাবির শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাতেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাবি, রাবি ও চবিতে আবাসিক হল খোলা রাখলেও বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে নিরাপত্তার অজুহাতে ঈদের ছুটির দিনগুলোতে আবাসিক হল বন্ধ রাখতো তৎকালীন প্রশাসন।তবে ২০২২ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের প্রবল দাবির মুখে, বেশ লম্বা সময় পর ঈদের ছুটিতে আবাসিক হল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সে সময়ের প্রাধ্যক্ষ পরিষদ।
এরপর থেকে ঈদের ছুটিসহ কোনো ছুটিতেই আবাসিক হল বন্ধ করেনি প্রশাসন। সবশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবাসিক হল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন প্রশাসন। এদিকে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে এসে ঈদের ছটিতে আবাসিক হলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল রাবির প্রাধ্যক্ষ পরিষদ। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভও দেখা দিয়েছিল।