চবির নারী শিক্ষার্থীকে শিবিরকর্মীর কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ঘিরে সমালোচনা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখার এক শিবিরকর্মীর বিরুদ্ধে। তিনি ক্যাম্পাসের অরাজনৈতিক সংগঠন ভয়েস অব স্টুডেন্ট’র জনসংযোগ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শনিবার (২৩ মে) ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামে ফেসবুক গ্রুপে তার এমন মন্তব্যের বিষয়টি জানাজানি হলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীরা নানা ধররে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর নাম আলি আহসান মোজাহিদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় ভয়েস অব স্টুডেন্ট থেকে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, শামসুন নাহার হল ও হল সংসদকে কেন্দ্র করে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ গ্রুপে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে এক নারী শিক্ষার্থী মন্তব্য করলে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের পরিচয় আড়াল করে ‘ScenicLizard7729’ নামের একটি বেনামি আইডি থেকে তাকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত অশালীন ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান।
ওই মন্তব্যে শিক্ষার্থীকে ‘আইছে বাম ব্যাশা (....)’ বলে কটূক্তি করা হয়। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, বেনামি আইডিটির পেছনে ছিলেন অভিযুক্ত মোজাহিদ। বিষয়টি নিশ্চিত হতে রুমি তাকে মেসেঞ্জারে সরাসরি মেসেজ করলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, তাকে এ কাজ করার জন্য ‘লেলিয়ে’ দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনার জন্য নারী শিক্ষার্থীর কাছে ক্ষমাও চান তিনি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘একটি পোস্টে মন্তব্য করার পর একটি বেনামি আইডি থেকে তাকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল ও আপত্তিকর ভাষায় মন্তব্য করা হয়। পরে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওই আইডিটি তার পরিচিত একজনের।’
তার ভাষ্য, অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে তিনি বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন এবং তাকে ছোট ভাই হিসেবেই চিনতেন। এছাড়া ওই ব্যক্তি নিজেই একাধিকবার ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গ্রুপ অ্যাডমিনদের উদ্দেশে ভুক্তভোগী বলেন, ‘আপনারা গ্রুপের একটা সীমারেখা ঠিক করেন। এভাবে বট আইডি থেকে নিয়মিত হয়রানি ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা হচ্ছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন?’
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত মোজাহিদকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে চাকসুর ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নারীর প্রতি প্রতিহিংসা এবং নারীদের নিয়ে বুলিংকারী সে যে-ই হোক না কেন, তাকে যথাযথ শাস্তির আওতায় আনা দরকার। কোনো ধরনের মারসি চলবে না। দল-মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে; কিন্তু ভাষা প্রয়োগের আদব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর থাকা প্রয়োজন, যেটা ছেলেটি লিমিট ক্রস করেছে।’
চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নারী শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল মন্তব্য ও অনলাইন হয়রানির অভিযোগই শিবিরের আসল চেহারা। ভিন্নমত প্রকাশ করলেই নারী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে ফেক আইডি ও বট অ্যাকাউন্ট থেকে কটূক্তি ও মানসিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। আমি তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাব জানাচ্ছি এবং একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাচ্ছি।’
আরও পড়ুন: পাবিপ্রবির ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাচ্ছেন না আবাসিক সুবিধা
শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘শিবির এ ধরনের কাজ করার জন্যই গুপ্ত থাকে। আদর্শের বাইরে অন্য কারো বিরুদ্ধে আপত্তিকর কিছু লিখলেও যাতে তাদের মুখোশ উন্মোচন না হয়। এ ধরনের বিভিন্ন কাজ এবং ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার জন্য এরা গুপ্ত থাকে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি, কয়েকদিন পর ঈদ।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ফোন করে এ বিষয়ে জানিয়েছি। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কি বলে? ক্যাম্পাসে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ রয়েছে, এ ঘটনায় তাদের ভূমিকা কি হয়, সেটা আমরা দেখার অপেক্ষায় রয়েছি।’
যে ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, সে শিবির কর্মী হলেও নিস্ক্রিয় দাবি করে শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, ‘এখানে সক্রিয়-নিস্ক্রিয় মূল বিষয় না। সে যে অপরাধ করছে, এর জন্য সাংগঠনিকভাবে শিবির কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী যদি প্রশাসনিক কিংবা যেকোনো ব্যবস্থা নিতে চায়, তাহলে সব ধরনের সহযোগিতা করবে শিবির।’
চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব ফেসবুকে লিখেছেন,‘ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নারী শিক্ষার্থীকে বুলিং বা হয়রানি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলে দল-মত-নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে চাকসু। কোনো শিক্ষার্থীর আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে চাকসুর লিগ্যাল এইড সেল থেকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করে অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করা হবে।’
বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দীর বক্তব্য চেষ্টা করেও জানা সম্ভব হয়নি।