বাড়িতে মাকে গলা কেটে হত্যা, ঢাবির ছাত্রী হলে হৃদয়বিদারক দৃশ্য
বগুড়ায় নিজ শোবার ঘরে মায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে পৌঁছায়, তখন ঘড়ির কাঁটায় প্রায় রাত ১১ টা। দূর গ্রাম থেকে আসা একটি ফোন কলে মায়ের গলা কাটা লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে মাঝরাতেই হলের ভেতর কান্নায় ভেঙে পড়েন মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী প্রার্থনা মজুমদার। তার সেই বুকফাটা আর্তনাদ আর আহাজারিতে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো হল, সহপাঠীদের অশ্রুজলে তৈরি হয় এক বাকরুদ্ধ ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার গভীর রাতে গ্রামের বাড়ি থেকে ফোন পেয়ে ওই ছাত্রী জানতে পারেন, তার মাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। খবরটি শুনে তিনি চিৎকার করে কান্না শুরু করলে আশপাশের অন্যান্য ছাত্রীরাও সেখানে জড়ো হন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং নিজ খরচে ওই ছাত্রীর বাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে ছাত্রীর ভাই ক্যাম্পাসে এলে তার সঙ্গেই ওই ছাত্রীকে বাড়িতে পাঠানো হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি জানার পরপরই আমি হল থেকে ছাত্রীকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। তার ভাই এসেছিলেন। একটি গাড়ি ভাড়া করে তার সঙ্গে ছাত্রীকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
ঘটনার খবর হলে জানাজানি হলে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হলের ছাত্রীরা সবাই নেমে এসেছিলেন। কান্নাকাটি করছিলেন অনেকে। মধ্যরাতে তখন কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। ছাত্রীরা ভাইও রুয়েটের ছাত্র ছিলেন।’
ভাই এলে নিজের টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে বাড়িতে পাঠিয়েছেন জানিয়ে প্রক্টর বলেন, ‘এ বিষয়ে ছাত্রীর পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনও সহযোগিতা লাগলে আমরা করব। আমরা সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছি।’
এদিকে আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আরও পড়ুন: নিজ ঘর থেকে ঢাবি ছাত্রীর মায়ের গলা কাটা লাশ উদ্ধার
তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, খবর পেয়ে রাতেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শয়নকক্ষের মেঝে থেকে ওই গৃহবধূর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার রহস্য উন্মোচনসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে।
ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি পারিবারিক কোন ঝামেলা থেকেই ঘটনার সূত্রপাত্র হতে পারে বলে মনে করছি। তবে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনার একটি মামলা থানায় রুজু করা হয়েছে।
পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাত ১০টার দিকে রাতের খাবার শেষ করে রীতা রানী ও তার স্বামী বিধান চন্দ্র রায় আলাদা দুটি ঘরে ঘুমাতে যান। রাত সোয়া ১২টার দিকে হঠাৎ নিজের ঘরের দরজায় জোরে ধাক্কার শব্দে বিধান চন্দ্রের ঘুম ভাঙে। একই সঙ্গে তিনি পাশের ঘর থেকে তার স্ত্রীর অস্বাভাবিক গোঙানির শব্দ শুনতে পান। দ্রুত স্ত্রীর ঘরে গিয়ে মেঝেতে রীতা রানীর গলাকাটা নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসার আগেই দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে ঘরের সদর দরজা খোলা দেখতে পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
তার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে আসার আগেই দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে। পরে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে গাবতলী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের নিজের ফেসবুক একাউন্টে লেখেন, নিহত এই নারী ঢাবির ১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী প্রার্থনা মজুমদারের মা। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে ঘরে ঢুকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে ফেললো। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর কত খারাপ হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা আমাদের সরকার বাহাদুরের টনক নড়বে? মানুষ কবে একটু নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমাতে যেতে পারবে?