চবির সেই ডিনের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, বেতন-ভাতা তুলছেন চেকে
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর। তবে নানা আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচিত ছিল ড. সালেহ জহুরের নাম। ফলে তার ডিন হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি ক্যাম্পাসে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গত মঙ্গলবার (১২ মে) এ নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসে ‘ইসলামী ব্যাংকসহ তিন কেলেঙ্কারি: মিলেমিশে ২০২৩ কোটি টাকা আত্মসাতে অভিযুক্ত শিক্ষককে চবিতে ডিন নিয়োগ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় বর্তমানে অধ্যাপক ড. সালেহ জহুর চৌধুরীর সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ভাতা চেকের মাধ্যমে তুলছেন এই শিক্ষক।
অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ থাকায় চেকের মাধ্যমে বেতন-ভাতা তুলছেন জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিয়ামক আমিরুল ইসলাম বলেন, উনার অ্যাকাউন্টে সমস্যা থাকায় আমাদের কাছে আবেদন করেন, সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা তাকে চেক দিই এবং তিনি চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকাটা তুলেন। এটা অনেকটা ক্যাশ টাকা দেওয়ার মতোই। তিনি চেক ব্যাংকে দিয়ে ক্যাশ টাকা তুলে নেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন বেতন-ভাতা তো পাবেনই। আর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তার সমস্যার কথা জানিয়েছেন যে তার অ্যাকাউন্টে ট্রানজিশন হচ্ছে না, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে, তাই তিনি একটি বিকল্প বের করেছেন।
জানা গেছে, ড. সালেহ জহুর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ঋণ অনিয়ম, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) ট্রাস্ট ও আইআইইউসি টাওয়ারের অর্থ ব্যবস্থাপনা, ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা তিনটি মামলার অভিযুক্তদের একজন। ইসলামী ব্যাংকের সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে তিনি এই ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত ছিলেন।
২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের পর বিপুল ঋণ বিতরণ ও অনিয়মে কিছু পরিচালক ও কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২২ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ইসলামী ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৯২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলম মাসুদের ছেলে আহসানুল আলমসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলায় তাকে আসামি করা হয়।
শুধু তাই নয়, ব্যাংকটির চট্টগ্রাম খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখা থেকে ৮২৭ কোটি ৪২ লাখ ১৫ হাজার ৪২৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি আহসানুল আলমসহ ৫২ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে দুদক। ওই মামলাতেও আসামি করা হয় তাকে। এই অর্থ বর্তমানে সুদসহ দাঁড়িয়েছে ৯১৮ কোটি ৫৭ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৮ টাকায়।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) টাওয়ারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়। আইআইইউসি টাওয়ার থেকে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবু রেজা নদভী দম্পতিসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এ মামলারও আসামি ড. সালেহ জহুর। মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ট্রাস্টের এই টাকা আত্মসাৎ করেন। আসামিরা ট্রাস্ট আইন ও বিধি উপেক্ষা করে ওই অর্থ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
এ ঘটনায় দুদক জানায়, ট্রাস্টের নামে প্রাপ্ত আয় সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের কথা থাকলেও আসামিরা তা নিয়মবহির্ভূতভাবে আত্মসাৎ করেছেন। পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়ার পরই মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও জানায় দুদক।
এ ছাড়া বিএনপির রাজনীতি করেন দাবি করলেও এই শিক্ষক সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এম এ মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এস আলম গ্রুপের সাইফুল ইসলামের একজন ঘনিষ্ঠ হিসেবেও তিনি পরিচিত।
সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এর অনেকগুলোই মিথ্যা। তিনি জানান, দুদক এ বিষয় নিয়ে তদন্ত করছে। তবে এখনো কোনো মামলায় চার্জশিট হয়নি। বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত হলে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন।
সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এম এ মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তার নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো বক্তব্য তিনি দেননি। হয়তো কোথাও বলেছেন তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
এ ছাড়া অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার (১৩ মে) ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর পরে কথা বলবেন বলে জানান এ প্রতিবেদককে।