০১ মে ২০২৬, ১২:৩২

কোলাহলের আড়ালে শ্রমের গল্প, মর্যাদা চান রাবির কর্মচারীরা

ঝাড়ু দিচ্ছেন রাবির কর্মচারীরা   © টিডিসি ফটো

ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটার আগেই ঝাড়ু হাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসের সড়কে কাজে নেমে পড়েন শ্রী অষ্টম কুমার বাহার। তখনো অধিকাংশ শিক্ষার্থী ঘুমে, চারপাশে নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই শুরু হয় তার দিনের লড়াই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাসে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীর কোলাহল, ক্লাস-পরীক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন অসংখ্য কর্মচারী। পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী এবং বিভিন্ন হলের স্টাফদের নিরলস পরিশ্রমেই সচল থাকে এই ব্যস্ত ক্যাম্পাস। তবে তাদের জীবনসংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা ও প্রত্যাশার গল্প অনেকটাই অজানা রয়ে যায়।

প্রতিদিন ভোর থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক, অ্যাকাডেমিক ভবন ও আবাসিক হল পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। দীর্ঘ সময় কাজ করলেও অনেকেই জানান, তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় কম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর সাপোর্ট স্টাফরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার্থীদের খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজে তারা নিয়োজিত থাকলেও তারাও ন্যায্য মজুরি ও কাজের পরিবেশ উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসকে সামনে রেখে এই শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা একটাই- স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি এবং একটি মানবিক কর্মপরিবেশ। প্রতিদিন নীরবে কাজ করে যাওয়া এই মানুষগুলোর শ্রমেই সচল থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দিন; তাদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। 

স্টুয়ার্ড শাখার পরিচ্ছন্নতা কর্মী শ্রী অষ্টম কুমার বাহার বলেন, অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়, কিন্তু এই কষ্ট খুব একটা কেউ দেখে না। সকাল নয়টা থেকে কাজ শুরু হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময়ই ডাকা হয়। 

তিনি বলেন, গতকাল পশ্চিম পাড়ায় একটা কুকুর ড্রেনে মরে পড়ে ছিল, পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে যায়। তখন আমরা গিয়ে পরিষ্কার করি, মাটি চাপা দিই। আবার কোনো হল বা শিক্ষকদের বাসায় পানির লাইন বা ড্রেন বন্ধ হলে সেটাও ঠিক করতে হয়। বেতনটা একটু বাড়লে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারতাম।

একই চিত্র নারী কর্মীদের জীবনেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী পরিচ্ছন্নতা কর্মী রহিমা বেগম বলেন, “সকাল থেকে কাজ করি, রোদ-বৃষ্টি কিছুই দেখি না। বাসায় গিয়েও সংসারের কাজ থাকে। সব মিলিয়ে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু এই কাজ ছাড়া আর উপায় নেই। আমরা চাই, অন্তত আমাদের কষ্টটা বুঝে একটু ভালো বেতন আর সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হোক।”

শুধু পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাই নন, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিন-রাত দায়িত্ব পালন করছেন নিরাপত্তা প্রহরীরাও।

নিরাপত্তা প্রহরী মোখলেসুর রহমান বলেন, তারা স্টুয়ার্ড শাখার অধীনে কাজ করেন এবং পালাক্রমে দিন-রাত ডিউটি করতে হয়। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। রাতের ডিউটি সবচেয়ে কষ্টকর, তবুও দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করি। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে আমাদের বেতন মেলে না। পে স্কেলটা যদি আরেকটু বাড়ানো যেত, তাহলে সংসার চালানো সহজ হতো।

এ বিষয়ে স্টুয়ার্ড শাখার উপ-রেজিস্টার মো. সোহরাব হোসেন বলেন, এই শাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে কাজ করে। প্রায় দেড়শতাধিক নিরাপত্তা প্রহরী অ্যাকাডেমিক ভবন, গেট ও আবাসিক এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বলেন, লেবার সেক্টরের কর্মীরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসের জঙ্গল, ঘাস ও লতাপাতা পরিষ্কার করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক সময় আমরা তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারি না। প্রশাসন ও সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, তাদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করা হোক এবং পে স্কেল বাড়ানো হোক।

তিনি আরও জানান, স্থায়ী কর্মচারীরা নির্ধারিত স্কেলে বেতন পেলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে মাস্টার রোল বা দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীরা কাজের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পান এবং অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকেই বঞ্চিত থাকেন।

এ কর্মচারীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তির একটি অংশ বলে মন্তব্য করেন রাবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন। তিনি বলেন, তাদের কল্যাণে প্রশাসন সবসময় সচেষ্ট রয়েছে এবং ধাপে ধাপে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।