২১ মার্চ ২০২৬, ১৬:১৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা ও প্রত্যাশা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা ও প্রত্যাশা  © টিডিসি সম্পাদিত

ঈদকে ঘিরে সবার মনেই থাকে নানান ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা, ও আনন্দের অনুভূতি। কারও কাছে ঈদ মানে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বিশেষ মুহূর্ত, কারও কাছে প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার উপলক্ষ্য, আবার অনেকের কাছে এটি নতুন স্বপ্ন ও আশার সূচনা। ঈদের এই বহুমাত্রিক অনুভূতি, প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে আজ আমরা জানবো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতামত, তাদের অভিব্যক্তি এবং ঈদকে ঘিরে তাদের ভাবনা ও আশার গল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা ও প্রত্যাশা জানাচ্ছেন মাইশা সিদ্দিকা-


ঈদের আনন্দ হোক সর্বজনীন; বৈষম্যহীন উৎসবের প্রত্যাশা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেবল আত্মকেন্দ্রিক স্বপ্নে বিভোর থাকে না; বরং তারা সমাজের এক অত্যন্ত সচেতন অংশ। ঈদের এই আনন্দঘন মুহূর্তেও তাদের ভাবনায় স্থান পায় দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে যখন নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনই কষ্টসাধ্য, তখন উৎসবের জাঁকজমক শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের অপরাধবোধের জন্ম দেয়। তাদের জোরালো প্রত্যাশা–ঈদের আনন্দ যেন মুষ্টিমেয় কিছু বিত্তবানের মাঝেই সীমাবদ্ধ না থাকে। সমাজের পিছিয়ে পড়া, সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোও যেন অন্তত ঈদের দিনটাতে একটু ভালো পোশাক পরিধান করতে পারে, পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটাতে পারে। এই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী ব্যক্তি উদ্যোগে কিংবা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে দরিদ্রদের মাঝে ঈদ সামগ্রী ও নতুন পোশাক বিতরণ করে। তাদের কাছে প্রকৃত ঈদ মানে হলো– বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে সবার সাথে উৎসবের এই নির্মল আনন্দ সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া।

জারির ইবনে কামাল
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ

ঈদ আনন্দে সম্প্রীতির আহ্বান
সম্প্রীতির ঈদ বয়ে আনুক নতুন আকাঙ্ক্ষা। মানুষ উজ্জীবিত চিত্তে অনুভব করুক আনন্দের জোয়ার। সুখ ও সমৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি জীবের তরে। ক্যাম্পাস থেকে মফস্বল সবখানেই বিদ্যমান থাক আনন্দের মঙ্গলবার্তা। ঈদ মানে শুধু আনন্দই নয় অন্যকে আনন্দিত করার দায়িত্ব বহন করা। নিজের এবং নিজের পরিবার ও সর্বোপরি সমাজে ছিন্নমূল মানুষদের পাশে থাকা ও তাদেরকেও ঈদের আনন্দ উপহার দেওয়া, সেই দায়িত্বের ক্ষুদ্র একটু অংশ। আসুন সবাইকে সাথে নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করি এবং সম্প্রীতির জোয়ার পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়। ঈদ শুধু মুসলিমদের জন্যই নয় পুরো বিশ্ববাসীর জন্য প্রত্যেকটি ধর্ম, সম্প্রদায় এবং জাতির জন্য আনন্দের। পূর্বের ইসলামী খেলাফত এবং অটোম্যান সাম্রাজ্যের ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। তাই অন্য ধর্মের বন্ধুদের সাথেও এই ঈদের আনন্দ উদযাপিত হোক এটাই মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা। ছোটদের ভালোবাসা এবং সালামি বিতরণ চালু থাকুক, সাথে অব্যাহত থাকুক সালামির জন্য ক্যাম্পাসের সিনিয়রদের পাকড়াও করা। সবশেষে ঈদের আনন্দ প্রবাহিত হোক জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, সকলকে জানাই ঈদ মোবারক। 

শাহেদ শাহরিয়ার লিখন
শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ

ব্যস্ততা ছেড়ে ঈদ: যেন এক স্বস্তির মুহূর্ত

ঈদ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব, যা আনন্দ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য উপলক্ষ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছেও ঈদ মানে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং ব্যস্ত একাডেমিক জীবনের মাঝে কিছুটা রিলিফ ও স্বস্তির সময়। সারা বছর ক্লাস, এক্সাম, অ্যাসাইনমেন্ট ও বিভিন্ন সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার পর ঈদ তাদের জন্য হয়ে ওঠে পরিবার-পরিজনের সাথে সময় কাটানোর অমূল্য সুযোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে পড়াশোনা করে। তাই ঈদ ভ্যাকেশন শুরু হলেই তাদের মনে জন্ম নেয় বাড়ি ফেরার তীব্র আকুলতা। পরিবারের সাথে ঈদের নামাজ আদায় করা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং শৈশবের স্মৃতিময় পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো, এসবই তাদের কাছে ঈদের বড় আনন্দ। আবার অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ঈদ মানে বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলনের সুযোগও বটে। তবে ঈদকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের কিছু প্রত্যাশাও থাকে। ঈদকে সামনে রেখে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবহন ব্যবস্থা, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত সিকিউরিটি এবং ছুটির স্কেডিউল এমনভাবে নির্ধারণ করা যাতে তারা নির্বিঘ্নে বাড়ি যেতে পারে এবং পুনরায় ক্যাম্পাসে ফিরতে পারে, এসব বিষয় তাদের কাছে অতিব গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু মিলিয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি পরিবার, বন্ধুত্ব ও মানবিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল উপলক্ষ। এই সময়টুকু তাদের মানসিকভাবে রিফ্রেশ করে এবং নতুন উদ্যমে আবার ক্যাম্পাস জীবনের ব্যস্তময় রুটিনে ফিরে আসার অনুপ্রেরণা দেয়।

রবিউল্লাহ শরীফ 
শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ

ঈদ বৃত্তান্ত-অদেখা আখ্যান

চলতি মাসের ৯ তারিখ হঠাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা আসায় শিক্ষার্থীদের মাঝে খুশির ঢল নেমে আসে। এর আগে গত নভেম্বরে সংগঠিত ভূমিকম্পের কারণে প্রায় দেড় মাস ধরে ডাকসু কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রেখেছিল, যা অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কিছুটা খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়েছে এবং এতে সেশনজটের সম্ভাবনাও বাড়ছিল। তবে ঈদের আগে আকস্মিকভাবে ছুটি ঘোষণার ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্বস্তি ও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আমরা লোক প্রশাসন ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থীরা বেশি খুশি, কারণ আমাদের মিডটার্ম পরীক্ষা চলছিল; একটি পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর বাকি পরীক্ষাগুলো ঈদের পর নেওয়া হবে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখলে, ঢাকার স্থানীয় অনাবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে ঈদকে ঘিরে আমার ব্যয় তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হল প্রশাসন কর্তৃক আয়োজনকৃত গরু ভোজ এবং ইফতার এর কথা না বললেই নয়; আবাসিক শিক্ষার্থীদের মাঝে রোজা ও ঈদের আনন্দ এর ব্যাপ্তি চমৎকারভাবে ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ঈদকে ঘিরে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি সবসময় থাকে না। আমার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আয় ও পারিবারের সহায়তা থাকা সত্ত্বেও, বর্তমান অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তা যেন ঈদের আনন্দকে সীমিত করে দেয়। 

জুনায়েদ শরণ
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ

সকলের মাঝে ছড়িয়ে যাকঈদের আনন্দ

রমজান মাস আরম্ভ হতে না হতেই যেন ঈদের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে যায়। ঈদ নিঃসন্দেহে প্রতিটি মুসলিম পরিবারে খুশির পসরা সাজিয়ে হাজির হয়। কিন্তু, সত্যিই কি তাই? ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েটির পরিবারের জন্য ঈদ কতটা আনন্দের? বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বিচার না পাওয়া পরিবারের জন্য ঈদ কতটা সুখ বয়ে আনবে? এবারের এই পবিত্র রমজান মাসকে মানুষের অবয়বে লুকিয়ে থাকা পিশাচেরা যেভাবে কলুষিত করেছে তাতে কত শত পরিবার যে এই ঈদ চাপা কান্নাকে অবলম্বন করে কাটাবে তা বোধহয় অগণিত। এছাড়া, চিরাচরিত আনন্দের ভেদাভেদ তো বরাবরই বিদ্যমান। একটি সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশে ঈদের চাঁদের ঐজ্জ্বল্য ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে। মানুষে মানুষে হৃদ্যতাময় ঈদ উদযাপিত হোক। নবগঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের হাত ধরে নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষেরা মুক্তি পাক সকল বৈষম্য আর নিপীড়নের করাল গ্রাস থেকে। ঈদের শুভেচ্ছা।

তাসনিম সুলতানা 
শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ 

ঈদে শেকড়ে ফেরা: আনন্দ ও প্রত্যাশার গল্প

ঈদ মানেই উৎসব ও আনন্দে মিলনের মুহূর্ত। কিন্তু সময়ের সাথে ঈদ উদযাপনের ধারায় দেখা দেয় নানারকম পরিবর্তন। তন্মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঈদকে ঘিরে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়, তাতে প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এবং আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট লক্ষণীয়। ঢাকায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের কেউ ব্যস্ত সেলফি তোলায়, কেউ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডায়, আবার কেউ পরিবার নিয়ে শহরের বাইরে ঈদ উদযাপন করতে পছন্দ করে। ঈদ কেবল মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে আত্মপ্রকাশ, আনন্দ ভাগাভাগি আর সামাজিক সংযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ্য। অনেকেই বাড়ি যেতে পারছে না। যারা যেতে পারেনি তারা ঢাকায় থেকে ঈদ উদযাপন করবে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকায় পড়াশোনা করতে আসে, যার ফলে ঈদের ছুটিতে পরিবারের টানকে কেন্দ্র করে হাজারো একাডেমিক প্রেশারের ফাঁকে এক আনন্দময় মুহূর্তের আশায় রওনা হয় বাড়ির উদ্দেশ্যে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে পরস্পর আন্তরিকতা ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে সকলেই পবিত্র ঈদ আনন্দ ও সন্তুষ্টিতে প্রিয়জনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার প্রত্যাশা করেন।

মো. আশরাফুল ইসলাম শিমুল
শিক্ষার্থী, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ

বাংলায় ঈদ উৎসব : অতীত-বর্তমান

আজকাল ঈদ বলতে আমরা জেন-জিরা বুঝি ট্রেন্ডিং এ থাকা জামা কাপড় শপিং, স্যোশাল মিডিয়ায় আপলোড, ঈদের দিন সকালে নামাজে যাওয়া, বাসায় এসে সারাদিন ঘুম কিংবা স্ক্রলিং। ঈদকে আমাদের কাছে শুধু মাত্র ধর্মীয় উৎসব হিসেবে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের ইতিহাস কি আসলেই এমন? আমার কাছে ঈদ একই সাথে ধর্মীয় রীতি-নীতি এবং বঙ্গীয় সংস্কৃতি। আমাদের পূর্ব পুরুষদের ইতিহাসও তাই বলে। আমরা বঙ্গদেশে ঈদ উৎসবের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাই, ১২০৪ সালে বঙ্গদেশে ইসলামের আগমন হওয়ার পর সুলতানীদের হাত ধরে ঈদ উদযাপন শুরু হয়। পরবর্তীতে মুঘল আমলে ঈদকে উৎসব আকারে পালন করা হয়। নবাবী আমলে ঈদকে খুবই জাঁকজমকভাবে পালন করা হতো। ঢাকায় ঈদের জামাতের পাশাপাশি চকবাজার ও রমনার ময়দানে ঐতিহাসিক মেলা বসতো। কাঠের খেলনা, ময়দা ও ছানার তৈরি বিভিন্ন মিষ্টান্ন, বাঁশি ইত্যাদি ছিলো উল্লেখযোগ্য বস্তু। জাদুঘরে পাওয়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, ঈদের মিছিলে নায়েব-নাজিমদের নিমতলী প্রাসাদ (বর্তমানে এশিয়াটিক সোসাইটির পেছনে), চকবাজার, হোসেনি দালানের মতো সেই সময়ের ঢাকার বিশেষ বিশেষ স্থাপনার সামনে দিয়ে যেত। এই ছিলো আমাদের ঈদ উৎসবের চর্চা। আমরা যদি এসব হারিয়ে যাওয়া দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করতে না পারি, তাহলে খুব সহজেই এইসব স্থান বিভিন্ন বিদেশি সংস্কৃতি এসে দখলে নিয়ে নিবে।

আব্দুল্লাহ আল মুবাশ্বির
শিক্ষার্থী, আরবী বিভাগ

স্বপ্নের ক্যাম্পাস থেকে নাড়ির টানে: ঈদ ভাবনা ও প্রত্যাশা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসের চাকা যখন ছুটির টানে ঘোরে, তখন প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে বেজে ওঠে ঘরে ফেরার সুর। ক্লাস-পরীক্ষা আর টিএসসির আড্ডার ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে এই সময়টা কেবলই প্রিয়জনদের কাছে ফেরার। হলের চার দেয়ালের যান্ত্রিকতা ছেড়ে মায়ের হাতের রান্না আর বাবার সস্নেহ আশীর্বাদের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুলতা প্রতিটি ঢাবিয়ানের হৃদয়ে এক পশলা প্রশান্তি নিয়ে আসে। 

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাই থাকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন এক যাত্রা, যেখানে পথের ক্লান্তি ম্লান হয়ে যাবে ঘরে ফেরার আনন্দে। তবে কেবল নিজেদের আনন্দেই তারা সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; তাদের ভাবনায় থাকে ক্যাম্পাসের আশপাশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানো। প্রত্যাশা এতটুকু—ঈদের এই অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন যেন ছুটির পরেও ক্যাম্পাসের প্রতিটি মোড়ে অমলিন থাকে। সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে এক নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে প্রিয় কার্জন হল কিংবা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ফেরার স্বপ্নই প্রতিটি শিক্ষার্থীর ঈদ রাঙিয়ে তোলে।

উম্মে হাবিবা ফারিয়া 
শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ

শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে নীড়ে ফেরার ঈদের আনন্দ 

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই দীর্ঘ ছুটি, অবসর সময়ের নেয় কোনো ত্রুটি। ঈদ মানেই বন্ধুদের সাথে আনন্দে মেতে ওঠা, হাজার ও ব্যস্ততার মাঝে পরিবারকে সময় দেয়া। আর এই ঈদ নিয়েই সবার যেন এক সীমাহীন আগ্রহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এই উদ্দীপনা যেন একটু বিশেষভাবেই কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর একজন শিক্ষার্থীকে সবথেকে যে জিনিসটা বেশি পীড়া দেয় তা হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। সারাদিনের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, মিড, কুইজ সাথে পরিবারকে ছাড়া এই ইট পাথরের শহরে দীর্ঘ এক সময় কাটানোর পর, ঈদের সেই লম্বা ছুটি যেন প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীর মনে স্বস্তির একটা বার্তা নিয়ে আসে।

রমজানের শুরু থেকেই বাড়ি ফেরার অপেক্ষা, অতঃপর আট থেকে দশ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রার পর প্রিয়জনদের হাসিমুখ দেখার অনুভূতি যেন এক অবর্ণনীয় আনন্দের ছোঁয়া দিয়ে থাকে। বাড়িতে ফিরে শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো অনেক সময় ‘ঈদের পরে ফাইনাল’কেও ভুলিয়ে দেয়। পরিশেষে, ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি নীড়ে ফেরা মানুষের কাছে, কারণ নীড়ে ফেরার আনন্দ বোঝে শুধু সেই প্রিয় মুখগুলো। সবার ঈদ হোক মিলন, ভালোবাসা এবং আনন্দের উৎসব।

শিলা খাতুন 
শিক্ষার্থী, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ

স্মৃতির পাতায় মিলনের ঈদ

প্রতিটি ঈদই আমার কাছে এক নতুন সজীবতার নাম, নতুন করে একবার ছোটবেলায় স্মৃতির সাগরে হারিয়ে যাওয়ার নাম। ঈদ মানে যান্ত্রিক আর কোলাহল জীবনের ব্যস্ততা ঝেড়ে 'স্বপ্ন টানে দিলাম পাড়ি' সুরে নিজের প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ফেরার এক পরম মুহূর্ত। আমার কাছে ঈদের আনন্দ মানে শৈশবের স্মৃতিঘেরা সেই আঙিনায় ফিরে যাওয়া, যেখানে আকাশে শাওয়ালের হিলাল দেখামাত্র বাবার সাদাকালো 'বাংলাদেশ টেলিভিশন' এ বেজে উঠতো 'ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ', সুরে সুরে সঙ্গ দিত মায়ের সংরক্ষিত বিলুপ্ত প্রায় একখানা ভাঙা রেডিও। রাত জেগে আমার ছোট্ট ছোট্ট দু'হাতে মায়ের পরশভরা মেহেদী রাঙানোর সেকাল সেসময় নতুনরূপে অনুভব করার জন্য সেই চিরচেনা নীড়ে ফেরার যে আকুলতা, সেটাই আমার কাছে ঈদ আনন্দ। চলমান বিশ্ব বাজারে তেলের সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশে তেলের বাজারে যে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে সেটিকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস তুলনামূলক আগে ছুটি পাওয়ায় একাডেমিক চাপের ক্লান্তিকে অবকাশ দিয়ে আমি ফিরলাম আমার চেনা আবেশে। ঈদ নিয়ে আমার প্রত্যাশা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, বরং চারপাশের অভাবী ও নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটাক, পারস্পরিক সহমর্মিতা আর ভ্রাতৃত্বের এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আসুক এই প্রার্থনা করি। কোনো লৌকিকতা নয়, বরং মনের গহীনে এক চিলতে প্রশান্তি নিয়ে আসুক এই আনন্দ। এই ঈদ হোক সবার জন্য বরকতময়।

তাবাচ্ছুমা বিনতে ছালেহ
শিক্ষার্থী, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি