ঈদের আনন্দ তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন তা সবার সঙ্গে ভাগ করা যায়: জাবি ভিসি
ঈদ মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এক মাস সিয়াম সাধনার পর এই উৎসব ঘিরে মানুষের মাঝে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের আমেজ তৈরি হয়। তবে ঈদ শুধু আনন্দের নয়, এটি মানুষের মধ্যে সমতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তাও বহন করে। এমনটাই মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান। শৈশবের ঈদের স্মৃতি, ঈদের সামাজিক তাৎপর্য এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ‘ঈদের গল্প’ আয়োজনে কথা বলেছেন তিনি।
ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদ শব্দটি শুনলেই আপনার শৈশবের কী ধরনের স্মৃতি মনে পড়ে?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান: ঈদ শব্দটি শুনলেই শৈশবের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। ঈদের নামাজ শেষে আমাদের বাসার পাশের বাজার থেকে নানা ধরনের খেলনা কিনতাম। সেগুলো খুব যত্ন করে রাখার চেষ্টা করতাম। একবার সানশেডের ওপরের তাকেতে খেলনা রাখতে গিয়ে পড়ে যাই। এরপর অনেকদিন মায়ের কোলে থাকতে হয়েছিল। ঈদ এলেই সেই স্মৃতিটা এখনও মনে পড়ে। ছোটবেলায় ঈদের আনন্দ এতটাই বেশি ছিল যে প্রিয় জিনিস সংগ্রহ করা এবং যত্ন করে সংরক্ষণ করার মধ্যেও এক ধরনের আলাদা সুখ খুঁজে পেতাম।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার মতে ঈদের প্রকৃত সামাজিক শিক্ষা কী?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান: ঈদের সময় আমরা দরিদ্র মানুষদের খাবার বা পোশাক দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করার চেষ্টা করি। অথচ বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে মাত্র দুইদিন আমরা তাদের কথা মনে করি, বাকি সময় তারা আমাদের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সমাজে প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু সম্পদের অসম বণ্টন এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ঈদের শিক্ষা হলো সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা এবং সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: শৈশব ও কৈশোরে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান: শৈশব ও কৈশোরের বেশিরভাগ সময় হোস্টেলে কাটানোর কারণে ঈদের ছুটি মানেই ছিল বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। ঈদের ছুটি পেলেই মনে হতো—এবার বাড়ি যাব, মায়ের সঙ্গে দেখা হবে। তিনিও অপেক্ষা করতেন। ঈদের আনন্দটা মূলত পরিবারকে ঘিরেই ছিল। তবে ছুটিটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যেত।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আগের ঈদ ও বর্তমানের ঈদের অনুভূতির মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেন?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈদের অনুভূতিতেও পরিবর্তন আসে। ছোটবেলায় ঈদের আনন্দ নিজে থেকেই ধরা দিত। কিন্তু বড় হওয়ার পর সেই আনন্দকে যেন খুঁজে নিতে হয়। তবে ঈদের সময় আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগটিকেই আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। এতে সামাজিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: সালামি পাওয়া আর দেওয়া—কোনটি বেশি আনন্দের বলে মনে করেন?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান: ছোটবেলায় সালামি পাওয়ার আনন্দ আলাদা। কিন্তু বড় হয়ে বুঝেছি, কাউকে কিছু দিতে পারার আনন্দ আরও বড়। অন্যের আনন্দের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যকে সাহায্য করার মধ্যেই প্রকৃত আনন্দ নিহিত।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদের কোন মুহূর্তটি আপনার কাছে সবচেয়ে আনন্দের?
অধ্যাপক ড. মোহাম্ম্মদ কামরুল আহসান: ঈদের সকালটাই আমার কাছে সবচেয়ে বিশেষ সময়। এক মাস রোজা রাখার পর ঈদের সকালে খাবারের অনুমতি পাওয়া এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি তৈরি করে। একদিকে দায়িত্ব পালন করার আনন্দ, অন্যদিকে একটি পবিত্র সাধনার সমাপ্তির অনুভূতি। রোজা আমাদের সংযমের শিক্ষা দেয়—যা শুধু এক মাস নয়, সারা বছর জীবনে প্রয়োগ করা উচিত।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার কোনো বার্তা আছে কি?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান: রমজানের এক মাস আমরা যেমন সংযম চর্চা করি এবং ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকি, সেই শিক্ষা যেন বাকি ১১ মাসেও ধরে রাখা যায়। যদি শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষা কাজে লাগাতে পারে, তাহলে তারা জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা এবং সৎগুণ চর্চায় নিজেদের আরও উন্নত করতে পারবে।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার মতে ঈদের প্রকৃত অর্থ বা বার্তা কী?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান: ঈদ অবশ্যই আনন্দের উৎসব। তবে সেই আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা সবার সঙ্গে ভাগ করা যায়। ঈদের নামাজে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়—সেখানে ধনী-গরিবের কোনো পার্থক্য থাকে না। এই চর্চাই সমাজে সমতা ও সম্প্রীতির বার্তা দেয়। যদি আমরা এই শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে ধীরে ধীরে সমাজের বৈষম্য কমে আসবে এবং সবাই সমান সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।