এটি ছিল ‘উদ্ধারকারী মিশন’, কখনও ‘চাকরি’ মনে করিনি—বিদায়ী বক্তব্যে ঢাবি ভিসি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নতুন ভিসি (উপাচার্য) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এছাড়া আরেকটি প্রজ্ঞাপনে গত মাসে পদত্যাগ করা বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের পদত্যাগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র গ্রহণের পরপরই বিদায়ী বক্তব্য দিয়েছেন অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। আজ মঙ্গলবার (১৭ জুন) বিকেলে জনসংযোগ দপ্তর থেকে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি এই বক্তব্য দেন তিনি। পাশাপাশি তার সময়ে উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জনও তুলে ধরা হয়।
অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের বিদায়ী বক্তব্যে যা আছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত সকল অংশীজন, শুভার্থী ও প্রিয় দেশবাসীর প্রতি...আপনাদের সবাইকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বিনীতভাবে জানাচ্ছি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতির জন্য আমার আবেদন সরকারের অনুমোদন পেয়েছে। আমি আজ আমার মূল পদ- তথা উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপনায় ফিরে যাচ্ছি। আমি মনে করেছি, আমার দায়িত্ব এখন শেষ হয়েছে। একটি আপৎকালীন সময়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে ছাত্রদের অনুরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল, প্রশাসনিক কাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে প্রথম লক্ষ্য ছিল একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থিতিশীলতায় ফেরানো। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উদয়াস্ত কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে।
এখন আর সেই আপৎকালীন নাজুক পরিস্থিতি নেই। উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার কাছে এটি ছিল ‘উদ্ধারকারী মিশন’ (Salvage Operation)। আমি কখনোই এটিকে ‘চাকরি’ মনে করিনি। আমার নিয়োগপত্রেও ‘সাময়িক’ নিয়োগের কথাটি লেখা ছিল।
চেষ্টা করেছি, সবাইকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল অবস্থা থেকে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসার। এখন বিভিন্ন মাপকাঠিতে বিশ্ববিদ্যালয় মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। এখনো সীমাবদ্ধতা আছে, তবে সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। আপৎকালীন পরিস্থিতি আমরা উত্তরণ করতে পেরেছি।
উপাচার্যের দায়িত্বটি আমার কাছে ছিল একটি ‘আমানত’। দায়িত্বকালে আমাদের বেশ কিছু অর্জন রয়েছে, কিছু ব্যর্থতাও আছে। উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর কয়েকটি- বিনীতভাবে আপনাদের জানাচ্ছি
স্মরণকালের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প
প্রায় ২,৮৪১ কোটি টাকার ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে ৬টি একাডেমিক ভবন নির্মাণ, ২৬০০ ছাত্রীর জন্য ৪টি আবাসিক হল নির্মাণ, ৫১০০ ছাত্রের জন্য ৫টি আবাসিক হল নির্মাণ, ৫টি ছাত্র হলের জন্য এবং ৪টি ছাত্রী হলের জন্য হাউজ টিউটর আবাসন সুবিধা তৈরি, শিক্ষক ও অফিসারদের জন্য ২টি আবাসিক ভবন নির্মাণ, ৫টি অন্যান্য ভবন (প্রশাসনিক ভবনসহ) নির্মাণ, ৪টি জলাধার সংস্কার এবং সৌন্দর্যবর্ধন, বিদ্যমান সার্ভিস লাইন মেরামত/সংস্কার, ১টি খেলার মাঠ উন্নয়ন, ২টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং ড্রেনেজ সিস্টেম ও ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট করা হবে। এছাড়া চীন সরকারের অর্থায়নে ২৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ছাত্রীদের জন্য পৃথক আরেকটি হল নির্মাণ করা হচ্ছে।
র্যাঙ্কিং ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
ক) টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গতবারের তুলনায় ২০০ ধাপ এগিয়ে ৮০০-১০০০ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া, কিউএস বিষয়ভিত্তিক টেকসই (Sustainability) র্যাঙ্কিংয়ে অংশগ্রহণ করে বিশ্বসেরা টেকসই বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬৩৪তম স্থান লাভ করেছে।
খ) যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্বখ্যাত শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (QS) প্রকাশিত ২০২৬ সালের ‘QS World University Rankings 2026’ তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। এবারের র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৫৮৪তম, যা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে।
গ) কিউএস বিষয়ভিত্তিক বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্থান পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি বিভাগ। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ক্যাটাগরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গতবছরের তুলনায় এবছর ১০০ ধাপ এগিয়ে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৪০১ থেকে ৪৫০ এর মধ্যে, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ ৫৫১ থেকে ৬০০ এর মধ্যে, ইঞ্জিনিয়ারিং-ইলেক্ট্রিক্যাল এবং ইলেক্ট্রনিক বিভাগ ৫০১ থেকে ৫৫০ এর মধ্যে, ইঞ্জিনিয়ারিং-মেকানিক্যাল, এরোনেটিক্যাল বিভাগ ৫০১ থেকে ৫৭৫ এর মধ্যে অবস্থান করছে।
সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ক্যাটাগরিতে গত বছরের তুলনায় ৫০ ধাপ এগিয়ে বর্তমানে সারাবিশ্বে ৪০১ থেকে ৪৫০ এর মধ্যে অবস্থান করছে। এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত একাউন্টিং অ্যান্ড ফিন্যান্সে বিভাগ ২৫১ থেকে ৩০০ এর মধ্যে, বিজনেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ ৪০১ থেকে ৪৫০ এর মধ্যে, ইকোনমিক অ্যান্ড ইকোনমেট্রিক্স বিভাগ ৩৫১ থেকে ৪০০ এর মধ্যে, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ৩০১ থেকে ৩৭৫ এর মধ্যে অবস্থান করছে।
লাইফ সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন ক্যাটাগরিতে মেডিসিন বিভাগ ৬৫১ থেকে ৭০০ এর মধ্যে অবস্থান করছে। ন্যাচারাল সায়েন্স ক্যাটাগরিতে ফিজিক্স অ্যান্ড এস্ট্রানোমি বিভাগ ৫৫১ থেকে ৬০০ এর মধ্যে অবস্থান করছে।
আর্টস অ্যান্ড হিউমেনিটিস ক্যাটাগরিতে ৫০১ থেকে ৫৫০ এর মধ্যে অবস্থান করছে।
ঘ) দ্বিতীয়বারের মতো প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশন ইন্টারডিসিপ্লিনারি সায়েন্স র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের ৯৪টি দেশের ৯১১টি বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে ৫২তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ঙ) বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশের সংখ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষস্থান অধিকার করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্কোপাস ডাটাবেজের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ’ ম্যাগাজিন এই তথ্য প্রকাশ করে।
চ) কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে এবং এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অবস্থান ছিল ১১২তম।
ছ) অসাধারণ গবেষণাকর্মের জন্য প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষক ও গবেষক বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এই তালিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ার প্রকাশ করেছে। এসব অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও একাডেমিক উৎকর্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
নিয়োগে স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ
নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি চালু করার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম (এসএমটি) গঠনের মাধ্যমে উপাচার্যের একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস করা হয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে উপাচার্যের ক্ষমতা ব্যবহারের পরিবর্তে সার্চ কমিটির মাধ্যমে উচ্চতর গবেষণাকেন্দ্র সমূহে পরিচালক নিয়োগ করা হয়। স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে গত ১৭ মাসে ৬৯ জন লেকচারার নিয়োগ করা হয়েছে। ২টি নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিযোগ আসার পর সিন্ডিকেট কর্তৃক পূর্ণাঙ্গ রিভিউ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ডাকসু নির্বাচন
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে।
জন ও ছাত্র কল্যাণমূলক কর্মসূচি
ক) আবাসিক হলে গণরুম প্রথা বিলুপ্তিকরণ
আবাসিক হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত গণরুম প্রথার কারণে শিক্ষার্থীদের মানবেতর পরিস্থিতিতে বসবাস করতে হতো; মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী এবং প্রভাবশালী ছাত্রনেতা-নেত্রীদের অবৈধ সিট দখলের ফলে অনেক সময় একটি কক্ষেই ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য করা হতো। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘদিনের গণরুম প্রথা বাতিল করে মেধা ও প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে আসন বণ্টনের নীতিমালা চালু করি, যা অতীতে কোন সময় হয়নি। ফলে হলগুলোর আবাসন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, ন্যায়সঙ্গতা ও স্বচ্ছতা প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রথম বর্ষের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা আবাসনের সুযোগ পাচ্ছে।
এছাড়া, হলগুলোতে সুপেয় পানির ব্যবস্থা, খাবারের মানোন্নয়ন, সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রম গ্রহণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
খ) শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নিয়মিত বাজেটের বাইরে ব্যয়
আবাসিক হলসমূহে প্রায় ৫.৫ কোটি টাকার আসবাবপত্র ও প্রায় ১.৫ কোটি টাকার ফ্যান সরবরাহ করা হয়েছে।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সংস্কার কাজের জন্য প্রায় ৫.২৫ কোটি টাকা, ভূমিকম্প পরবর্তী বিভিন্ন হলের সংস্কার কাজে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
গ) বিশেষ আপৎকালীন আর্থিক সহায়তা
হলে আবাসিক সিট পাওয়ার সকল শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও যেসব ছাত্রীকে আসন বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব অর্থায়নে বিশেষ আপৎকালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ন্যায্যতা ও প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে ৫টি ছাত্রী হলের অসচ্ছল ও প্রান্তিক ছাত্রীদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা হারে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ঘ) ট্রান্সক্রিপ্ট, মার্কশীট ও সার্টিফিকেট সেবায় শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ
শিক্ষার্থীদের ট্রান্সক্রিপ্ট, মার্কশীট ও সার্টিফিকেট সংক্রান্ত সেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ট্রান্সক্রিপ্টের অনলাইন আবেদন পদ্ধতি কার্যকর রয়েছে এবং আবেদন ও উত্তোলনের ধাপসমূহ ওয়েবসাইটে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
ঙ) অনলাইনে ভর্তি ফি প্রদান
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথমবর্ষ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের জামানতসহ বিভিন্ন ফি অনলাইনে বা নিজ নিজ অফিসে জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ফি জমা দেওয়ার ভোগান্তি দূর হয়েছে এবং ভর্তি প্রক্রিয়া আরও সহজ ও শিক্ষার্থীবান্ধব হয়েছে।
চ) ক্যাম্পাসে শাটল পরিবহণ সার্ভিস চালুকরণ
শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ চলাচল সহজ ও সুবিধাজনক করার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো তিনটি নির্ধারিত রুটে ক্যাম্পাসে শাটল পরিবহণ সার্ভিস চালু করা হয়েছে।
ছ) অনলাইনে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট তালিকাভুক্তিকরণ
রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট তালিকাভুক্তি ম্যানুয়েল পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ অনলাইনে রূপান্তর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড ও ফি পরিশোধ সম্পন্ন হবে।
জ) মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নে পদক্ষেপ
শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন ও জরুরি চিকিৎসা সেবা জোরদারে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স, এক্স-রে ও ইসিজি যন্ত্রপাতি সংযোজনের পাশাপাশি ইমার্জেন্সি ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।
ঝ) কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কার
তুরস্কের সর্ববৃহৎ বেসরকারি সাহায্য সংস্থা IDDEF-এর অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক এই মসজিদ কমপ্লেক্সে ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগসহ সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়ও মসজিদ পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত আছে। প্রায় ৪০ বছর পর বেসরকারি উদ্যোক্তা সহায়তায় মসজিদের ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নানা উদ্যোগ
ক) সর্বোচ্চ পূজামন্ডপ
অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এবছর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একযোগে সর্বাধিক ৭৬টি পূজামন্ডপে সরস্বতী পূজা উদযাপন করা হয়, যা গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ অন্তর্ভুক্তির বিবেচনাধীন রয়েছে।
খ) আনন্দ শোভাযাত্রা
সকল শ্রেণি ও নৃ-গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে বৃহত্তম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের করা হয়।
গ) ঈদ শোভাযাত্রা
ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে গতবছর সকলকে নিয়ে সর্বজনীন ‘ঈদ শোভাযাত্রা’ বের করা হয়।
ঘ) চৈত্র সংক্রান্তির বিশেষ ছুটি
চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে বিশেষ ছুটি অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়া, নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে আগামী ১২-১৬ এপ্রিল উৎসব চলাকালীন পরীক্ষা গ্রহণ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যন/ইনস্টিটিউটের পরিচালককে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ঙ) বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উত্তরপত্র আলাদা প্যাকেটে রেখে সরাসরি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে প্রেরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
‘সাত কলেজ’ পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান
সরকার ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘সাত কলেজ’ বিষয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান করা হয়। ‘সাত কলেজের’ সব প্রশাসনিক, একাডেমিক ও আর্থিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে নতুন নীতিমালা
স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব সংক্রান্ত পদক্ষেপ সমূহ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কর্নার’, ডাকসু ভবনে ‘জুলাই স্মৃতি সংগ্রহশালা’ এবং নবনির্মিত ‘জুলাই শহিদ স্মৃতি ভবন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহিদ ও আহতদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। সংগ্রহশালায় শহিদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, ডকুমেন্টারি নির্মাণ, গ্রাফিতি সংরক্ষণ, স্মরণিকা প্রকাশ, জুলাই যোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন ও স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের মতো উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ‘জুলাই শহিদ স্মৃতি ভবন’-এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকার জন্য স্বীকৃতি অর্জন
পরিবেশ সংরক্ষণে অনুকরণীয় ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সম্মাননা অর্জন করেছে। আতশবাজি, পটকা ও ফানুস নিষিদ্ধ করে বায়ু, শব্দ ও রাসায়নিক দূষণ হ্রাস, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমানো, পাখি ও বন্যপ্রাণী রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবদানের জন্য সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে এই স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
শিক্ষাগত উৎকর্ষতা ও শিল্প-সংযোগ
ক) শিক্ষা ও গবেষণার আধুনিকায়ন, শিল্প-সংযোগ শক্তিশালীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের বাজারমুখি দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ পদক্ষেপ হিসেবে ‘Industry Collaboration and Employment Committee (ICEC)’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
খ) শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার দক্ষতায় বিশেষ সার্টিফিকেট কোর্স চালু
করা হয়েছে।
গ) জব ফেয়ার আয়োজন করা হচ্ছে।
ঘ) পাইলট ভিত্তিক রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চালু করা হয়েছে।
আরও কিছু বিশেষ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে:
ক) গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার জন্য ডেমোক্রেসি ল্যাব স্থাপন
খ) ২৭টি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং ভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ
গ) ইউনেস্কো চেয়ার স্থাপন
ঘ) কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ২৯টি আন্তর্জাতিক মানের ই-রিসোর্স সাবস্ক্রাইব
ঙ) ট্রাস্ট ফান্ড প্রতিষ্ঠার হার ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি
চ) যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন এবং বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে পদক্ষেপ
ছ) ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
বিশেষ কিছু উদ্যোগ
প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্ধের মাধ্যমে ভূমিকম্প পরবর্তী আবাসিক হলসমূহের অবকাঠামোগত সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ করা হয়।
নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সমাজভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অপরাপর অংশীজনের সহযোগিতায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রচেষ্টা চালানো হয়।
নতুন প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ
আমি যেভাবে দেখি- নতুন প্রশাসনের সামনে ইমিডিয়েট চ্যালেঞ্জ হলো ৩টি। তা হলো:
১. ২ হাজার ৮শ’ ৪১ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে সম্ভাব্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে পেশাগত দক্ষতার সাথে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা।
২. বিকেন্দ্রীকরণ-সহ প্রশাসনিক এবং আর্থিক যে সংস্কার কার্যক্রম, যা কিছু উপরে উল্লেখ করেছি তা চালু রাখা ও সংহত করা।
৩. রাজনৈতিক বিবেচনায় আবাসিক হলে দখলদারিত্ব এবং গণরুম প্রথা চালুর মতো নিবর্তনমূলক সম্ভাব্য প্রবণতা মোকাবিলা করা, ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির প্রকৃতি বিষয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে মতৈক্যের ভিত্তিতে ‘সামাজিক চুক্তি’ তৈরির যে উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছিলাম, কাজও শুরু করেছিলাম- তবে তা শেষ করতে পারিনি- তা চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা, ছাত্র সংসদ নির্বাচনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাপর নির্বাচন ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ফোরামসমূহ পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা এবং সরকারি ও সরকার দলীয় নির্ভরতা কমিয়ে সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা।
আবারও আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, আমার কোনো দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, কোনো সময়ে আমার কোনো দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলে আমাকে জানান। আমি কোনো ছাত্র সংগঠনকে সুবিধা দেই নি, অসুবিধাও করিনি। অসত্য বয়ানকারী ও চরিত্রহননকারীদের প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। এ’বিষয়গুলোর মূল্যায়ন আমি দেশবাসীর উপরই ছেড়ে দিতে চাই এবং এক্ষেত্রে আমি মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করি।
পরিশেষে বলতে চাই, অনেকদিন কঠোর পরিশ্রম করেছি। এখন আমার কিছু বিশ্রাম প্রয়োজন। আমার কাজগুলো যারা সহজ করেছেন- বিশেষ করে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম, ডিনবৃন্দ, প্রভোস্টবৃন্দ, বিভাগের চেয়ারম্যান/ইনস্টিটিউটের পরিচালকবৃন্দ, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ এবং সর্বোপরি প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং সুযোগ্য ছাত্র প্রতিনিধিবৃন্দ- তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, একজন যোগ্য উত্তরসূরি আমার ভাই ও বন্ধু অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে যাচ্ছি। তাঁর নতুন প্রশাসনের জন্য রইল নিরন্তর শুভকামনা।
আমার অনেক সীমাবদ্ধতা এবং ব্যর্থতা সত্ত্বেও আপনাদের সবার সমর্থনে এবং সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের প্রত্যক্ষ অবদানে ভালো যা কিছু করার তৌফিক আল্লাহ আমাকে দিলেন-তার জন্য আপনাদের সবার প্রতি আবারও কৃতজ্ঞতা। এই দীর্ঘ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাই।
আমি দেশে এবং শিক্ষা সেবাতেই থাকছি- ইনশাআল্লাহ। দেশের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনে যদি কোন কাজে লাগতে পারি, তার জন্য সব সময় প্রস্তুত আছি। আপনাদের প্রত্যেকের জন্য দোয়া ও শুভ কামনা। ভালো থাকুন।