০৪ মার্চ ২০২৬, ১৪:৪১

ধর্ষণ, হত্যা ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ঢাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ

ঢাবির অপরাজেয় বাংলার পদদেশে প্রতিবাদ সমাবেশে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা  © টিডিসি

দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ, হত্যাসহ নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বুধবার (৪ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পদদেশে এ প্রতিবাদ সমাবেশ পালন করেন তারা।

এ সময় শিক্ষার্থীদের ‘We want justice, Justice’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।

সমাবেশে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী  আফিয়া হোমায়রা জেবু বলেন, ‘আমাদের আজকের এই দাবি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে। আমরা ধর্ষণমুক্ত সমাজ চাই। বছরের পর বছর ধরে আমরা নারী ক্ষমতায়ন এবং নারী স্বাধীনতার কথা বলে আসছি। কিন্তু সমাজে যদি এমন পদ্ধতিগত বাধা থাকে, তবে সেই ক্ষমতায়ন কোনো কাজে আসবে না। একজন নারী যখন ঘর থেকে বের হন, তখন তার মনে প্রথম চিন্তা থাকে যে তিনি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না। যখন ৬ বছরের একটি শিশুকেও এই আশঙ্কায় থাকতে হয়, তখন বুঝতে হবে দেশের মানুষের মানসিকতা ও পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বাড়লেও, যতক্ষণ পর্যন্ত রাস্তায় বা জনপদে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ নারী ক্ষমতায়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই এই পাশবিক ঘটনাগুলো কঠোর হাতে দমন করার জন্য।’

সমাবেশে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জাহিন আবদুল্লাহ গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, ‘নারীদের প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আমরা আরেকটি বীভৎস ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। দেশে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার অবসান না ঘটলে এই সহিংসতা থামানো সম্ভব নয়।’

এ সময় উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. সৈয়দ মো. শেখ ইমতিয়াজ বলেন, ‘ধর্ষণের মতো অপরাধ রোধে সরকারের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত জিরো টলারেন্স নীতি। কেবল অপরাধের খবর নয়, বরং অপরাধীর শাস্তির খবরও মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করতে হবে। মানুষ যেন দেখতে পায় যে অপরাধ করলে পার পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, ‘দেশে যথেষ্ট আইন আছে, কিন্তু সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ নেই।  ধর্ষণের ঘটনাগুলোতে প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। এক দল হয়তো অপরাধ করে, অন্য দল তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। সকল রাজনৈতিক দলের উচিত তাদের কর্মীদের জন্য জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা এবং কোনো অপরাধীকে আশ্রয় না দেওয়া।’

মো. শেখ ইমতিয়াজ বলেন, ‘যারা একবার অপরাধ করে জেল থেকে বের হয়, তাদের কোনো সঠিক হিসেব বা রেজিস্ট্রি রাখা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা মানসিক বিকৃতির কারণে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে (পেডোফিলিয়া বা এ জাতীয় সমস্যা)। তাই অপরাধীদের সঠিক কাউন্সেলিং এবং তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা জরুরি।’

ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য একটি ‘জাতীয় কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এই কমিশনে একাডেমিয়া (শিক্ষাবিদ), অ্যাক্টিভিস্ট এবং এনজিও প্রতিনিধিদের রাখা উচিত, যারা ধর্ষণের পেছনের কারণগুলো গবেষণা করবেন এবং নিয়মিত মনিটরিং করবেন।

এ ছাড়াও মো. শেখ ইমতিয়াজ বলেন, ‘স্কুল, কলেজ এবং এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও জেন্ডার ট্রেনিং বা নারী-পুরুষের সমতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের শেখাতে হবে কোনটি সহিংসতা আর কোনটি নয়। ধর্ষণের শিকড় অনেক গভীরে। একজন মানুষ যখন বাজে কথা বলে বা ছোটখাটো হেনস্তা করে, সেখান থেকেই ধর্ষক মানসিকতার জন্ম হয়। তাই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন পরিকল্পনা নিতে হবে যেন তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশ সুস্থ ও সুন্দরভাবে ঘটে।’