২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২৬

১০ বছর আগে ঢাবির হল থেকে বের করে নির্যাতন ছাত্রলীগের, মামলার প্রস্তুতি ছাত্রদল নেতার

আল মামুন ইলিয়াস  © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক আল মামুন ইলিয়াস ১০ বছর আগে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে ‘অমানুষিক’ নির্যাতনের শিকার হন। দীর্ঘ সময় পর আজ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে এ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন এবং মামলার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

আল মামুন ইলিয়াসের দেওয়া পোস্টটি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে দেওয়া হলো-

‘২৭/০২/২০১৫ 
ছবি গুলো আমার উপর বর্বরোচিত নির্যাতনের, ছবি গুল সাক্ষ্য দিচ্ছে একজন ছাত্রদল কর্মীর নির্যাতনের ও সাক্ষ্য দিচ্ছে একজন কর্মীর ত্যাগের। আমি এই নির্যাতনের বিচাই চাই, মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি,সবার সহযোগিতা কামনা করছি। প্রায় একযুগ আগের নির্যাতনের চিহ্ন শরীরে এখনো বিদ্যমান।

সেই ভয়াল নির্যাতন মনে হলে এখনো ভয়ে কুঁকড়ে উঠি। কি পরিমাণ হিংস্র হলে একজন অনুজ,অগ্রজ ও সহপাঠীকে এইভাবে নির্যাতন করতে পারে? আমার কি অপরাধ ছিল? আমার পরিবারের কি অপরাধ ছিল? আমি ছাত্রদলের কর্মী এবং শহীদ জিয়াউর রহমানের মত মহান নেতাকে ভালবাসি, খালেদা জিয়ার মত দেশ প্রেমিক নেত্রীর অনুসারী ছিলাম, এই আমার অপরাধ?

আমার হল এসএম হল। ২০১৩ সালের ৩০ আগস্ট আমি এসএম হল ছেড়ে দিয়ে বাহিরে থাকি। সেই দিন পরীক্ষা প্রস্তুতি নেয়ার জন্য রাতে গিয়েছিলা জগন্নাথ হল( ঢাবি) এ। রাতের খাবার খেয়ে জগন্নাথ হলের অতিথি কক্ষে আমার হলের দুই বন্ধুর সাথে গল্প করছিলাম, রাত ১০ টার একটু বেশি হবে। অই সময় এসএম হল ছাত্রলীগের প্রায় ৭০-৮০ জন নেতা কর্মী আমাকে অতিথি কক্ষ থেকে টেনে বের করে অতিথি কক্ষের দরজা থেকে মারপিট শুরু করে। সেখান থেকে মারতে মারতে এসএম হলের গেট পর্যন্ত নিয়ে যায়, এই সময় তাদের হাতে ক্রিকেট স্ট্যাম্প, হকিস্টিক, রড ও গাছে কাচা ডাল ছিল। যা সব গুলোই আমার শরীরে আঘাত করে, পায়ে রড দিয়ে আঘাত করে। এরপর দফায় দফায় ১১:৩০ মিনিট পর্যন্ত মারধর করে।

১১:৩০ মিনিট এ আমাকে প্রক্টর টিমের হাতে তুলে দেয়,কারন তখন শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে, নিজেদের কে সেভ করতে প্রক্টর টিমের হাতে তুলে দেয়। হয়তো সেদিন আল্লাহ রহমত ও আমার মায়ের দোয়ায় বেচে গেছি। নয়তো আবরারের জায়গা আমার হতে পারত।

এর পর প্রক্টর টিম আমাকে নিয়ে যায় শাহবাগ থানায় এবং মামলা দেয়। থানায় আমি অনুরোধ করেছিলাম যে আমার পরীক্ষা কিছুদিন পরে আমাকে ছেড়ে দিন, কিন্তু তারা আমাকে ছাড়ে নাই। পুলিশ সদস্যরা আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আমাকে নিয়ে এসে গারদে রেখে দেয়। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা এবং রক্ত খরন হচ্ছিল। সেখানে কিছু অন্য কারনে কয়েক জন ব্যক্তি গ্রেফতার ছিল।তারা আমার অবস্থা দেখে তাদের সর্বোচ্চ টুকু দিয়ে সাহায্য করেছে। আমার শরীর পরিষ্কার কতে দিয়েছে, আমার পাশে বসে থেকে সান্ত্বনা দিয়েছে, এমন কি আমার শরীরে মলম লাগিয়ে দিয়েছে। আমি ওই মানুষ গুলোর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।

এরপর শুরু হয় পরিবারের প্রতি আর এক নির্যাতন। থানায় আমার মেজো ভাই আসে, সেও তখন বগুড়া থেকে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত এবং পলাতক অবস্থায়। কিন্তু ভাইয়ের বিপদে নিজেকে নিরাপদ রাখার চিন্তা না করে রাতেই থানায় আসে। পুলিশ আমাকে অনেক বড় মামলায় অভিযুক্ত করবে এমন বক্তব্য দেয় পুলিশ। বলে রাখা ভাল আমাকে গ্রেফতার করার ৩ দিন আগে বই মেলায় একজন ব্লগার খুন হয়েছিল। পুলিশ তার হত্যা মামলায় আমার নাম দিতে চেয়েছে। এতে আমার ভাই ভিত হয়ে পরে। উপায় না পেয়ে একটি জমি যার দাম অই সময় ১০-১২ লক্ষ টাকা হত শুধু আমাকে বাঁচাতে সেই জমি অর্ধেক দামে বিক্রি করে পরদিন থানায় দেয়, এবং আমাকে যেন অন্তত খুনি হিসাবে না দেখায়। কিছুদিন আগে আমাদের ওই বিক্রি করা জমি বর্তমান মালিক প্রায় ১ কোটি টাকা বিক্রি করে।
বলে রাখা ভাল, তখন পুলিশ এবং ছাতলীগের গ্রেফতার বানিজ্য চলছিল। ছাত্রলীগ কাউকে ধরে দিলে থানা থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন পেত ছাত্রলীগ। আমি পরে জানতে পারি যে থানা থেকে ছাত্রলীগকে যে কমিশন দেয়া হয় তা দিয়ে তারা মদ পার্টি দিয়েছিল।

আমার মা আমার নির্যাতনের খবর পাওয়ার পর থেকে অসুস্থ হয়ে পরে। আমার বন্ধু খোকনের কথা না বলে পারছি না, রাতে থানায় আমাকে দেখতে যায়। আমার শরীরের খত চিহ্ন দেখে নিজের শরীর থেকে জামা খুলে আমাকে দিয়ে আসে। এবং ওইদিন কিছুটা ঠান্ডা ছিল, সে খালি গায়ে হলে ফিরে ছাত্রলীগের রোষানলে পরে। এর কিছু সময় পর আমার মাকে ফোন করে জানায় আমার অবস্থা। বন্ধু খোকনের সেই রাতের উপকার আমাকে ঋণী করেছে।

আমার মা খবর পাওয়ার পর থেকে মুখে পানি পর্যন্ত নেয় নাই। নিজের শরীরের কষ্টের থেকে আমার মার জন্য বেশি কষ্ট হচ্ছিল। এখানে তৎকালীন প্রক্টর আমাকে কোন সাহায্য তো করেই নাই বরং আমাকে যেন কোনোভাবেই ছাড়া না হয় সেই বিষয় এ ওসিকে নির্দেশনা দেয়। আমার বিপদে এগিয়ে এসেছিল যারা তারা আমার আইই আর এর সহপাঠী। আমি তাদের প্রতি ঋণী। তন্বী, জসিম,জাকির,মুজাহিদ, আখি রাহুল,জাকিয়া, রাশেদ মিলন, শাহাদাত তীরন্দাজ, রাসেল আরো অনেকে।

আমার নিরাপত্তা প্রহরী ছিল জহিরুল ইসলাম বিপ্লব, সাবেক সহ-সভাপতি কেন্দ্রীয় ছাত্রদল, আব্বাস ভাই, সাবেক সদস্যও তুহিন ভাই। সার্বক্ষণিক আমার জন্য তারা থানার আশে পাশে অবস্থান করত আমি তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।

আমার শিক্ষক জনাব শাহ শামীম আহমদ, যিনি থানায় গিয়ে ওসিকে বলেছিলেন যে, আমার ছাত্রের যদি কোন অপরাধ থাকে তাহলে সেই অপরাধ আমার, কারন আমি তার শিক্ষক, যদি কোন ভুল করে থাকে তাহলে আমি তাকে ভাল শিক্ষা দিতে পারিনি। ওকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে লকাপে রেখে দিন। শত অসহায় অবস্থার মধ্যেও নিজেকে এতটা একা মনে হয়নি যার শিক্ষক এভাবে শিক্ষার্থীর পক্ষে কথা বলতে পারে এটা তো পরম পাওয়া ওই ছাত্রের জন্য।

নানা নাটকীয়তার পর আমাকে তিনদিন পর কোর্টে চালানো করে।এরপর জেলে। জেল জুলুম সহ্য করে দীর্ঘদিন পর মুক্তি। আমার উপর হওয়া নির্যাতন যেন আর কোন ভাইয়ের উপর না হয় এ জন্য আমি এর বিচার চাই।’