শুধু র্যাংকিং নয়, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে: ইউজিসি চেয়ারম্যান
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
সোমবার (১৭ আগস্ট) ঢাকার শেরাটন হোটেলে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) আয়োজিত ‘কিউএস বাংলাদেশ ফোরাম-২০২৬’-এ তিনি এ কথা বলেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু র্যাংকিং কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হতে হবে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান, জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও কর্মসংস্থানযোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার রূপান্তরের লক্ষ্যে ইউজিসি পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ পরিকল্পনার আওতায় গবেষণার মানোন্নয়ন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর, আন্তর্জাতিকীকরণ এবং দেশ-বিদেশের পরিবর্তনশীল চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব হলো গবেষণা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং সেই জ্ঞান সমাজ ও অর্থনীতির অগ্রগতিতে কাজে লাগানো। আর ইউজিসির অন্যতম দায়িত্ব হলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে রূপান্তর করা, যাতে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতীয় উন্নয়নের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের বিভিন্ন সূচক ও মানদণ্ড থেকে বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি কার্যকর মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা, সক্ষমতা ও জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার মান, গবেষণা, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থানযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা এসব কিছুর সমন্বিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
দেশের উচ্চশিক্ষায় সুযোগ ও মানের বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে দেশে ১৮০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অবকাঠামো, শিক্ষক, গবেষণা, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পার্থক্য কমিয়ে সব শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ইউজিসি এ লক্ষ্যেই কাজ করছে।
তিনি বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে থাকলেই যে তার শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সফল হবে—এমনটি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমকে শিল্প খাত ও চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা দক্ষতা এবং পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলক কম ব্যয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, স্থানীয় প্রেক্ষাপটে শিক্ষার অবদান এবং দেশের উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
তিনি বলেন, র্যাংকিংয়ে ভালো করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষক উন্নয়ন, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু র্যাংকিংয়ের পেছনে ছুটলে টেকসই ফল পাওয়া যাবে না।
ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের সেবাদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তির বিষয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক র্যাংকিং ব্যবস্থায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে চাই। তবে একই সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর, গবেষণার মানোন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কাজ এগিয়ে নিতে হবে। র্যাংকিং হবে আমাদের অগ্রগতির একটি সূচক; কিন্তু শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের সাফল্যই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে নিতে সরকার, ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একক দায়িত্ব নয়; জাতীয় উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশীদারিত্ব প্রয়োজন।
ফোরামে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। অনুষ্ঠানে কিউএসের ভাইস প্রেসিডেন্ট-স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল এনগেজমেন্ট ড. অশ্বিন ফার্নান্দেজ, চিফ কমার্শিয়াল অফিসার জেসন নিউম্যান, এআইইউবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশের (এপিইউবি) মহাসচিব ইশতিয়াক আবেদীন, এপিইউবির সভাপতি ড. সবুর খান এবং এআইইউবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও চেয়ারম্যান নাদিয়া আনোয়ার বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে ইউজিসি’র সদস্য, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের সদস্য, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এআইইউবির উদ্যোগে আয়োজিত ‘কিউএস বাংলাদেশ ফোরাম-২০২৬’-এ সহযোগিতা করেছে কিউএস, ইউজিসি ও এপিইউবি। আয়োজকদের মতে, কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংস ২০২৮ সামনে রেখে আয়োজিত এ ফোরাম বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদার, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে ধারণা বিনিময় এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর রোডম্যাপ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।