ইউজিসি থেকে গায়েব ছাত্রলীগের শোভন-রব্বানীর ‘২ কোটি ঈদ সেলামি’ তদন্তের নথিপত্র
৬ বছর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের কাছ থেকে ‘দুই কোটি টাকা ঈদ সালামি’ চেয়ে পদ হারান তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন) কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রেজওয়ানুল ইসলাম শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী। এই ঘটনার পরপরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে তদন্ত কমিটি করার পর ৬ বছরেও তদন্ত শেষ করতে পারেনি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদারক এই সংস্থাটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ঘটনার ফাইলসহ তদন্তের নথিপত্র গায়েব হয়েছে খোদ ইউজিসি থেকে।
জানা যায়, ২০১৯ সালে তৎকালীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফারজানা ইসলামের কাছে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী ‘ঈদ সেলামি’ হিসেবে বড়ো অঙ্কের অর্থ দাবি করেছিলেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা। এই অভিযোগ ও আন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শোভন-রাব্বানীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সেবছরই শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে। আহ্বায়ক করা হয় ইউজিসির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজ বেগমকে। ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম দস্তগীরকে মহাসচিব ও সদস্য করা হয় অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীরকে। পরে কমিটির প্রধান হন অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর। অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর তদন্তে অপারগতা জানিয়ে ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগকে নতুন করে কমিটি করার পরামর্শ দেন।
এরপর ২০২২ সালে কমিশনের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ কর্তৃক এই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় ইউজিসির তৎকালীন পূর্ণকালীন সদস্য বিশ্বজিৎ চন্দ্র দাসকে। তবে নতুন কমিটি গঠনের ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত প্রতিবেদন।
তবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসলে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর ইউজিসির স্ট্র্যাটেজিক প্লানিং এন্ড কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স-এসপিকিউএ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক আকরাম আলী খানকে কমিটির কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রশাসন বিভাগে জমা দেওয়া এবং জমাদানে ব্যর্থ হলে পরবর্তী দুই কর্মদিবসের মধ্য তার ব্যাখ্যা/কৈফিয়ত প্রদানের জন্য দেওয়ার কথা নির্দেশনা দেয় সংস্থাটি।
সবশেষ, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আকরাম আলী খানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ইউজিসি। নোটিশে বলা হয়, আপনি (আকরাম আলী খান) চাহিত নথিপত্র/ডকুমেন্টস সরবরাহ করেননি এবং প্রেরিত পত্রের কোনো জবাব প্রদান করেননি, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ২(খ) অনুযায়ী 'অসদাচরণ (Misconduct)' এর শামিল।
‘‘অতএব, এহেন কর্মকাণ্ডের জন্য সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী কেন আপনার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা পত্র জারির দশ কর্মদিবসের মধ্যে কমিশনের সচিব বরাবরে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর জন্য আপনাকে নির্দেশ প্রদান করা হলো।’’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউজিসির এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অজানা কারণে তদন্ত কার্যক্রম থেমে গেছে এ ঘটনায়। ফাইলটা ইউজিসি থেকে গায়েব করে ফেলা হয়েছে। তখন প্ল্যানিংয়ে ফাইলটার দায়িত্বে ছিলো আকরাম আলী খান। উনি ফাইলটা হারিয়েছেন। ফাইল না পেলে নতুন করে তদন্ত শুরুও সম্ভব না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আকরাম আলী খান বলেন, শোকজের উত্তর আমি দিয়েছি। এ সংক্রান্ত ফাইল যেটা ছিলো তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ্র দাসের (তৎকালীন ইউজিসি সদস্য) টেবিলে রেখেছিলাম। এরপর আর পাওয়া যায়নি। উনি ফেরত দেননি। এটা আমি আগেই সমাধান করেছিলাম। বর্তমান প্লানিংয়ের ডিরেক্টর এটা সমাধান করে দিয়েছিলেন। ইউজিসি সচিব ফখরুল ইসলাম এটা নিয়ে সমস্যা তৈরি করছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে ইউজিসির সাবেক সদস্য ও বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র দাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি। তিনি বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে ইউজিসির প্লানিং অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ভূঁইয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি প্ল্যানিংয়ে তখন ছিলাম না। এই ফাইলটা আকরামের ডেস্কে ছিল। আমি তো ঐভাবে সমাধান করতে পারিনি। সমাধান বলতে ফাইলটা খুঁজে বের করা, সেটাতো সম্ভব হয়নি। বিশ্বজিৎ স্যার তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন, তার তো এখন খোঁজ নেই। কিন্তু আকরামকে এককভাবে দোষ দিলে হবে না, পুরো উইংয়ের দায়িত্ব ছিলো।
ইউজিসির যুগ্মসচিব তাহমিনা রহমানের সঙ্গে কথা বলা হলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কথা বলতে পারবো না। ইউজিসি সচিব স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে ইউজিসির সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) জাবির অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে এক হাজার ৪৪৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেয়। ২০১৯ সালের জুনে ছয়টি আবাসিক হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। এরপর তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকল্প থেকে দুই কোটি টাকা ‘ঈদ সেলামি’ হিসেবে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় ২০১৯ সালের আগস্টে আন্দোলনে নামেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কয়েক মাসব্যাপী ওই আন্দোলন এক পর্যায়ে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে রূপ নিয়েছিল। শেষমেষ উপাচার্য টিকে গেলেও, ছাত্রলীগের শীর্ষ পদ হারাতে হয় শোভন ও রাব্বানীকে।
উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ছাত্রলীগকে চাঁদা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন উপাচার্য ফারজানা ইসলাম। তবে তিনি জানিয়েছিলেন, ছাত্রলীগের সে সময়ের নেতারা তার কাছে কমিশন চেয়েছিলেন।
ইতিমধ্যে ৬টি আবাসিক হলের নির্মাণকাজ শেষে শিক্ষার্থীরা বসবাস করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার হল, গ্রন্থাগার, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টার নির্মাণও প্রায় শেষ। কিন্তু গত ৬ বছর ধরে ইউজিসি অনিয়ম তদন্তে গড়িমসি করে চলেছে। সর্বশেষ এ ঘটনার ফাইলসহ তদন্তের নথিপত্র গায়েব হল। ফলে আলোচিত এই ঘটনাটি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেই গেল।