৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:২৯

পকেটে স্মার্টফোন রাখলে কমতে পারে শুক্রাণু, যা বলছেন গবেষকরা 

প্রতীকি ছবি  © সংগৃহীত

স্মার্টফোন এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। চাকরি, যোগাযোগ, ইন্টারনেট কিংবা ব্যাংকিং লেনদেন—সবকিছুতেই এর ব্যবহার রয়েছে। পুরুষেরা সাধারণত প্যান্টের সামনের পকেটে মুঠোফোন রাখেন। তবে এ অভ্যাস পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। গবেষণায় মুঠোফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণের সংস্পর্শে শুক্রাণুর গতিশীলতা ও কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ্যত্বের সরাসরি কারণ, এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

ভারতের ডেম হেলথের প্রতিষ্ঠাতা এবং রিনিউ হেলথ কেয়ারের স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. রাজীব আগরওয়াল এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, বিষয়টি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি গবেষণার ফলাফল একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও উচিত নয়।

শুক্রাণুর ওপর মুঠোফোনের প্রভাব নিয়ে একাধিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি গবেষণা এবং ৪ হাজারের বেশি বীর্যের নমুনা নিয়ে করা একটি বিশ্লেষণও রয়েছে। সেখানে মুঠোফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণের সংস্পর্শের সঙ্গে শুক্রাণুর গতিশীলতা ও কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে প্যান্টের সামনের পকেটে মুঠোফোন রাখলে সেটি অণ্ডকোষের কাছাকাছি অবস্থান করে। কিছু গবেষণায় এ অবস্থায় শুক্রাণুর ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকেরা এর পেছনে দুটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত, মুঠোফোন থেকে নির্গত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণ শুক্রাণুর কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হলো শরীরে ক্ষতিকর ফ্রি র‍্যাডিকেল এবং সেগুলো নিষ্ক্রিয় করার কাজে নিয়োজিত অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। এ অবস্থায় শুক্রাণুর কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

দ্বিতীয়ত, মুঠোফোন থেকে উৎপন্ন তাপ অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। অথচ সুস্থ শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শুক্রাণুর স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এসব তথ্যের বড় একটি অংশ এসেছে গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষার ফলাফল থেকে। বাস্তব জীবনে এর প্রভাব নিয়ে গবেষণায় ভিন্ন চিত্রও পাওয়া গেছে।

ডা. রাজীব আগরওয়াল জানান, সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন এমন দম্পতিদের নিয়ে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত গবেষণায় পকেটে মুঠোফোন রাখার অভ্যাসের সঙ্গে শুক্রাণুর গুণমান কিংবা গর্ভধারণে প্রয়োজনীয় সময়ের কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

তাই মুঠোফোন ব্যবহারকে বন্ধ্যত্বের প্রমাণিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, এ বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

তবে শুক্রাণুর গুণমান ও স্বাস্থ্যের অবনতির ক্ষেত্রে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে উল্লেখ করেছেন এই চিকিৎসক। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কো-এনজাইম কিউ টেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাত্রা কমতে পারে এবং শুক্রাণুর গতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

চিকিৎসক জানান, মুঠোফোনের বিকিরণের ফলে শুক্রাণুর যে অক্সিডেটিভ ক্ষতি হতে পারে, কো-এনজাইম কিউ টেন সেই জৈবিক প্রক্রিয়ার ওপর কাজ করে। তবে এটি মুঠোফোনের বিকিরণজনিত ক্ষতি প্রতিরোধের প্রমাণিত প্রতিষেধক নয়। সামগ্রিকভাবে শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের উন্নতিতে এর কার্যকারিতার পক্ষে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই ও লাইকোপেনের মতো উপাদানও শুক্রাণুর স্বাস্থ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিভিন্ন র‍্যান্ডমাইজড ট্রায়ালে প্রমাণ পাওয়া গেছে। জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম শুক্রাণুর ঘনত্ব এবং গঠনগত বৈশিষ্ট্য উন্নত করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, লাইকোপেন অক্সিডেটিভ ডিএনএ ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এসব উপাদান পুরুষের প্রজননক্ষমতা বাড়ানোর চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা হয়। তবে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে গেলে শুধু মুঠোফোন ব্যবহারকে এর কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণেও শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমতে পারে। তাই এমন সমস্যা দেখা দিলে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া