ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে যেসব খাবার খাবেন, যেসব খাবেন না
দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপে প্রতিনিয়ত বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে এডিস মশার কামড় থেকে বেঁচে থাকার পরামর্শ দেন ডাক্তাররা। তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তখন কঠোরভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলার পাশাপাশি রক্তের হিমোগ্লোবিন আর প্লাটিলেট কাউন্ট বাড়াতে মেনে চলতে হয় নির্দিষ্ট ডায়েট বা খাদ্য তালিকাও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রাথমিক পর্যায়ে শক্ত খাবারের তুলনায় তরল খাবার গ্রহণ করা ভালো। অল্প অল্প করে তরল খাবার খেলে শরীরের পানিশূন্যতা পূরণ হওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়তা করে। এ সময় পানি, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, ফলের জুস, স্যুপ ও শরবত বেশি করে খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ। ‘ডিইএনভি’ ভাইরাসের কারণে এ রোগ হয়। আক্রান্ত হওয়ার ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত এর উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, মাংসপেশিতে ব্যথা ও হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা। কখনো ত্বকে র্যাশও দেখা দিতে পারে। এ সময় পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় ভিটামিন গ্রহণের মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধরে রাখা জরুরি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল কাদের বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে তরল খাবারের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবারও দিতে হবে। এ সময় পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও ক্লান্তির পাশাপাশি রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই খাবারের তালিকায় প্রোটিনযুক্ত খাবার রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে পানি, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন ও ফলের জুস বেশি বেশি খাওয়াতে হবে। এছাড়াও চিকেন স্যুপ, বাদাম, পুডিং খুব উপকারী ও সহজপাচ্য খাবার। জ্বরে আক্রান্ত রোগী যেহেতু ভারী খাবার খেতে পারে না, তাই পুষ্টিকর হালকা খাবার একটু পরপর গ্রহণ করলে শরীরের পর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ হয়। খাবারে স্বাদ বাড়ানোর জন্য লেবুর রস ব্যবহার করা যেতে পারে।’
প্লাটিলেটের মাত্রা ঠিক রাখার বিষয়ে ডা. আব্দুল কাদের বলেন, ‘ব্রোকলি, পালং শাক আয়রন, ভিটামিন কে, পটাসিয়াম এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টের একটি সমৃদ্ধ উৎস, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এই খাবারটি প্লাটিলেট বাড়ানোর একটি কার্যকর উপায়।’
তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত অবস্থায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের পাশাপাশি তৈলাক্ত, মশলাদার ও ভাজা খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ডেঙ্গুর চিকিৎসা প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গু জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা ১০২ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে।’
তিনি বলেন, এ সময় মাথায় পানি দেওয়া ও শরীর মুছে জ্বর কমানোর চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি ছয় থেকে আট ঘণ্টা পরপর জ্বরের তীব্রতা বুঝে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়াতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের মূল চিকিৎসা হিসেবে শরীরে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পানির পাশাপাশি ফলের রস, স্যুপ, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি ও শরবত খাওয়ানোর পরামর্শ দেন।
ডেঙ্গু রোগীকে পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডা. হাসান হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভাইরাল ফিভারের মূল ওষুধই হলো বিশ্রাম। কারণ বিশ্রাম আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে রোগের বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ তৎপর হওয়ার সুযোগ করে দেবে। তবে খেয়াল রাখবেন বিশ্রামের সময়টুকু যেন সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেম কিংবা অহেতুক নেট ব্রাউজ না করা হয়।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৬০ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২৭১ জন। মৃতদের মধ্যে পুরুষ ১২৮ জন এবং নারী ১৩৯ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নারী ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে মারা গেছেন ১২৩ জন। এছাড়া বরিশাল বিভাগে ২২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৫ জন, খুলনা বিভাগে ৫২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৩ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৮ জন, রংপুর বিভাগে ৬ জন এবং সিলেট বিভাগে ২ জন মারা গেছেন।